খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে মাত্র ১১টিতে জয় পেয়েছে বিএনপি। এর চারটি আসন খুলনা থেকে হলেও নতুন মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাননি কেউই। এতে হতাশা দেখা দিয়েছে বিএনপি নেতাকর্মী ও নাগরিক সমাজের মধ্যে। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের একদফায় ফ্যাসিবাদের পতনের পরও বৈষম্যমুক্ত হতে পারলো না খুলনা। বরং বৈষম্যের দৃষ্টান্তই হয়ে রইল খুলনা-এমনটি অভিমত খুলনাবাসীর।
নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, নব্বই-পরবর্তী বিএনপি’র তিনটি সরকারে খুলনা থেকে কেউ মন্ত্রী হননি। অথচ আওয়ামী লীগের ৫টি সরকারের মন্ত্রিসভায়ই খুলনা থেকে পূর্ণমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। নতুন বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় খুলনা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করে দীর্ঘ বঞ্চনার অবসানের দাবি ছিল নাগরিক নেতা ও দলটির কর্মীদের। তাদের সে আশা পূরণ হয়নি।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে খুলনা বিভাগের ৬টি জেলার সব আসন জিতেছে জামায়াত। যশোরের ৬টি আসনে ৫টিতেই হেরেছে বিএনপি। বাগেরহাটের ৪টির মধ্যে তিনটিতেই জয় পায় জামায়াত। ব্যতিক্রম শুধু খুলনা। এই জেলার ছয়টি আসনের চারটিতেই জিতেছেন বিএনপি প্রার্থীরা। একটিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল পরাজিত হয়েছেন। যে কারণে মন্ত্রিসভায় খুলনা বিভাগের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতে এই জেলা থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অগ্রাধিকারের দাবি উঠেছিল।
খুলনা জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু বলেন, ‘বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে ভালো করায় আমরা জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে রকিবুল ইসলাম বকুল, আজিজুল বারী হেলাল বা আলী আসগার লবীর মধ্য থেকে একজনকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম। তবে পার্টির চেয়ারম্যানসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটাই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক ধরে নিচ্ছি।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, আঞ্চলিক নেতারা মন্ত্রী হলে এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। সেই আশা থেকে বিভাগীয় সদর হিসেবে খুলনায় মন্ত্রী আশা করেছিলাম। কিন্তু কিছুটা হতাশ হতে হয়েছে।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, খুলনার মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়ে সম্মানিত করেছে। তাই দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের উচিত ছিল খুলনা থেকে মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিদান দেওয়া।
এদিকে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির নেতৃবৃন্দ এক বিবৃতিতে বলেছেন, খুলনা বিভাগীয় সদর হিসেবে বর্তমান মন্ত্রিসভায় খুলনার কোন প্রতিনিধিত্ব না থাকায় আমরা অত্যন্ত ব্যথিত। স্বাধীনতা উত্তর খুলনা যে বারবার বঞ্চিত হয় এটি তারই আরেকটি উদাহরণ। মন্ত্রিসভায় যাতে খুলনার প্রতিনিধিত্ব থাকে তার জোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিদাতারা হলেন সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান, মহাসচিব এডভোকেট শেখ হাফিজুর রহমান হাফিজ, মো. নিজাম-উর রহমান লালু, মিনা আজিজুর রহমান, শাহীন জামাল পন, অধ্যাপক মো. আবুল বাশার, অধ্যক্ষ রেহানা আক্তার, মিজানুর রহমান বাবু, অধ্যাপক মো. আযম খান, মো. খলিলুর রহমান, মামুনুরা জাকির খুকুমনি, মো. মনিরুজ্জামান রহিম, সরদার রবিউল ইসলাম রবি, মোল্লা মারুফ রশীদ, সৈয়দ এনামুল হাসান ডায়মন্ড, মনিরুল ইসলাম, শেখ গোলাম সরোয়ার, মতলুবুর রহমান মিতুল, প্রফেসর সেলিনা বুলবুল, এডভোকেট মনিরুল ইসলাম পান্না, শেখ আব্দুস সালাম (শিরোমনি), প্রকৌশলী রফিকুল আলম সরদার, শেখ আরিফ নেওয়াজ, বিশ্বাস জাফর আহমেদ, জি এম রেজাউল ইসলাম, এস এম আকতার উদ্দিন পান্নু, প্রকৌশলী সেলিমুল আজাদ, মো. হায়দার আলী, মনজুর হাসান অপু, রকিব উদ্দিন ফারাজী, মো. শফিকুর রহমান, শিকদার আব্দুল খালেক, মো. ইলিয়াস মোল্লা, মো. আব্দুস সালাম, প্রবাসী বাংলাদেশী এস এম ইকবাল হোসেন বিপ্লব, এস এম মুর্শিদুর রহমান, নির্বাহী সদস্য এডভোকেট মিনা মিজানুর রহমান, এডভোকেট শেখ আবুল কাসেম, এডভোকেট কুদরত ই খুদা, আফজাল হোসেন রাজু, আসাদুজ্জামান মুরাদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবু জাফর, তরিকুল ইসলাম, এইচ এম আলাউদ্দিন, মোরশেদ উদ্দিন ও সাইফুল ইসলাম পিয়াস। এদিকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান মঙ্গলবার সকালে খুলনার শহীদ হাদিস পার্কে ডিজিটাল ডিসপ্লে স্ক্রিনে সম্প্রচারের আয়োজন করে সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি)। এদিন প্রথমে বিএনপির পরে জামায়াত-এনসিপির সংসদ সদস্যদের শপথ প্রচার হয়। বিকেলে মন্ত্রী পরিষদের শপথ অনুষ্ঠানও সরাসরি সম্প্রচার হবে বলে জানিয়েছিলেন কেসিসির প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোল্লা মারুফ রশিদ।
এ উপলক্ষে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপনের পাশাপাশি শামিয়ানা টানিয়ে দু'শতাধিক চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়। কেসিসির কর্মকর্তা কর্মচারী ছাড়াও সাধারণ নগরবাসী এবং বিপুলসংখ্যক পথচারী আগ্রহ নিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। নগরীর দোলখোলার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী মোফাজ্জল হোসেন মর্নিংওয়াক করতে এসে আয়োজন দেখে বাড়ি না ফিরে থেকে যান। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়া শেষে বলেন, এই সংসদের কাছে জাতির অনেক প্রত্যাশা। তারা সফল হোক, শুধু এইটুকু চাওয়া।
পার্কের পশ্চিম দিকের মেইন গেটের গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ডিসপ্লে বোর্ডে অপলক তাকিয়ে ছিলেন আজিজুল। রিকশা চালকের সিটে বসেই দেখার ও শোনার চেষ্টা করছিলেন অসীম আগ্রহে। ভোট দিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পরে গতকালই ফিরেছেন খুলনায়। আগে কোনোদিন শপথ নেওয়া অনুষ্ঠান না দেখা খুলনা শহরের রিকশাচালক আজিজুলের সরল ভাষ্য, শপথে যা যা বললো, তা তা মেনে চললে দেশের ভালো হবে। আর না মানলে আওয়ামী লীগের মতো লুটপাট করলে আবারও খারাপ দিন আসবে।
ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়া আজিজুলের আসনে বিজয়ী হয়েছে দাঁড়িপাল্লা। জেলার চারটি আসনই জামায়াতের। আজিজুলের দাবি, হাসিনা নেই। যারা জয়ী ও যারা পরাজিত হয়েছে- সবাই মিলে দেশচালক।