দেশের অন্যতম বৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল স্থলবন্দর এ মিথ্যা ঘোষণা, ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানি এবং বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চালিয়ে আসছে, যার সঙ্গে বন্দরের কিছু কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকতে পারেন।
সূত্র জানায়, ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক বন্দরে প্রবেশের পর নির্ধারিত শেডে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকির কথা থাকলেও বাস্তবে সেই প্রক্রিয়ায় শৈথিল্যের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু শেডে কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণা দিয়ে উচ্চ শুল্কের পণ্য খালাস করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অনিয়মের বিনিময়ে ঘুষ লেনদেন হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে, এবং অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে পণ্য ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের একাংশ কয়েকজন শেড ইনচার্জের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে একই স্থানে দায়িত্ব পালন করায় একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে উঠেছে, যা শুল্ক ফাঁকির সুযোগ সৃষ্টি করছে। প্রশাসনিক নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বদলি কার্যকর না হওয়ায় জবাবদিহিতার ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে বলেও তারা মনে করছেন।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে বলে দাবি করা হয়। গত ১৪ মার্চ ব্রেকিং পাউডার নামে ঘোষিত একটি চালানে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশি চালিয়ে উচ্চ শুল্কের শাড়ি, থ্রি-পিস, কসমেটিকস ও ওষুধ উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রাায় ৬ কোটি টাকা। এর আগে ৯ মার্চ ঘাসের বীজ হিসেবে ঘোষিত চালান থেকে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ পাট বীজ উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া ১৮ জানুয়ারি ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য ধরা পড়ে একটি মোটরপার্টস চালানে, যার ফলে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়। সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন এসব পণ্য শনাক্ত না হলে সেগুলো শুল্ক ছাড়াই বাজারে প্রবেশ করত কি না।
এরও আগে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কয়েক কোটি টাকার একটি শাড়ি ও থ্রি-পিসের চালান বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অতিক্রম করে বাইরে চলে যায়। পরে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অভিযানে তা আটক করা হয়। ঘটনাটি বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আরও উদ্বেগজনক অভিযোগ হচ্ছে, বিপুল সংখ্যক আমদানি ঘোষণার বিপরীতে কাস্টমস সিস্টেমে বৈধ বিল অব এন্ট্রির তথ্য পাওয়া যায়নি। এতে শুল্ক আদায়ের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বেনাপোল কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রায় ১ হাজার ৮শ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যদিও এই সময়ে আমদানি কমেনি, বরং উচ্চমূল্যের পণ্যের পরিমাণ বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পণ্যের মূল্য কম দেখানো, মিথ্যা ঘোষণা এবং অনিয়মের মাধ্যমেই এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, বন্দরের কিছু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একাধিক শেডে দায়িত্ব পালন করে প্রভাব বিস্তার করছেন, যা একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এতে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির নেতারা বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারে অনিয়ম অব্যাহত থাকলে তা শুধু রাজস্ব খাতেই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তারা দ্রুত তদন্ত, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে বন্দর পরিচালক মো: শামীম হোসেন বলেন, কিছু ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণার পণ্য আটক করা হলেও সব অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার পর ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের মিল পাওয়া যায়। তবে ব্যবসায়ীদের একাংশ তার এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন এবং তারা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।