শ্যামনগর উপজেলা সংবাদদাতা, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নে জাইকা (JICA) অর্থায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একটি চাঁদাবাজির মামলায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হাজী মোঃ নজরুল ইসলামকে আসামি করা হলে তিনি অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেছেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আর-রাদ কর্পোরেশনের আইন কর্মকর্তা মোঃ জালাল উদ্দিন বাদী হয়ে শ্যামনগর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এতে চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম, তার ছেলে আঃ রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি, মারধর, ছিনতাই ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়, গত ১৯ মে রাতে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে আসামিরা ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন এবং তা না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন। এ সময় প্রকৌশলী জাহিদ হাসানকে মারধর করে আহত করা হয় এবং তার কাছ থেকে একটি দামী স্মার্টওয়াচ ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, এর আগে থেকেই আসামিরা বিভিন্নভাবে প্রকল্পের কাজে বাধা দিয়ে আসছিল এবং প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করায় বর্তমানে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। এতে কোটি কোটি টাকার নির্মাণসামগ্রী ও ভারী যন্ত্রপাতি নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, “এটি একটি সাজানো নাটক। প্রকৃতপক্ষে আমি ও স্থানীয় জনগণ ঠিকাদারের অনিয়ম, ভূমি দখল ও জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় আমাকে ফাঁসাতে এই মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর জাইকা অর্থায়নে প্রকল্পটির ঠিকাদার হিসেবে সবুজ খান নিয়োগ পান। অভিযোগ রয়েছে, কাজ শুরুর সময় নির্ধারিত স্থান হিসেবে যে এলাকা চিহ্নিত করা হয়, সেটি ছিল মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত একটি চিংড়ি মহাল। পরবর্তীতে কোনো প্রকার সমঝোতা ছাড়াই ওই জমি বালু ভরাট করে দখলে নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করা হলে তিনি জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া সঠিক হয়নি বলে মত দেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাসে কাজ চালিয়ে যান ঠিকাদার। কিন্তু এখনো ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ক্ষতিপূরণের দাবিতে তিনি ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন, যা তদন্তের জন্য এসিল্যান্ড কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়। এছাড়া ২০২৫ সালের ৫ মার্চ মানববন্ধন ও স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঠিকাদার সবুজ খান এলাকায় ব্যাপক ভূমি দখল, পরিবেশ ধ্বংস এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করেছেন। তার ভাষ্যমতে, প্রায় ১৫০-২০০ বিঘা জমি অবৈধভাবে দখল, হাজার হাজার গাছ কাটা, একটি শ্মশানঘাট দখল, এমনকি প্রায় ২০০০ বিঘা জমিতে মৎস্য ও কাঁকড়া চাষের পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, প্রকল্প এলাকার পূর্ব পাশে প্রায় ১০ একর জমিতে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ ও ভেকু দিয়ে মাটি কাটার অভিযোগও ওঠে। এতে স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন এলাকাবাসী।
চেয়ারম্যানের অভিযোগ, “আমি এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে অবহিত করে ঘটনাস্থলে নিয়ে গেলে ঠিকাদারপক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে তদন্তের নামে আমাকে ডেকে নিয়ে সারাদিন বসিয়ে রেখে রাতে মিথ্যা মামলা রুজু করা হয়।”
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ আলী খান জানান, বর্ষার আগে কাজ শেষ করা না গেলে পুরো উপকূলীয় এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়বে। অথচ বারবার বাধা ও হুমকির কারণে কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
মামলার বাদী দাবি করেন, পুরো ঘটনাটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ রয়েছে। আহত জাহিদ হাসান ও ফেরদৌস শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে এবং সাইটে থাকা কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।