চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় পুরোপুরি প্রাইভেট অপারেটরের ওপর নির্ভর করলে জাতীয় নিরাপত্তা ও কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিদেশী অপারেটর নির্ভরতা বাড়লে দেশীয় দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ কমে যেতে পারে। বন্দর পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে থাকা জরুরি। ঝুঁকি ও কৌশলগত বিবেচনার এসব তথ্য উঠে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) চালু করার লক্ষ্যে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রফিকুল ইসলামকে আহবায়ক ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) গোলাম ছরওয়ারকে সদস্য সচিব করে এনসিটি চালু করার জন্য ২০১৪ সালে ১০সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন-অর্থ মন্ত্রণালয় যুগ্ম সচিব মো. মফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সদস্য (প্রকৌশল) কমডোর জুলফিকার আজিজ, আইন মন্ত্রণালয় যুগ্ম সচিব, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড একাউনটেন্ট অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিনিধি নাসিম আনোয়ার, পরিচালক, এফবিসিসিআই, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-প্রধান (পরিকল্পনা) মো.এনায়েত হোসেন, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগা – সচিব নাসির আরিফ মাহমুদ।
বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ কার্যক্রম সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ–এর মাধ্যমে। বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধি ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় বন্দরে নির্মিত হয় ১ হাজার মিটার দীর্ঘ নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে টার্মিনালটি পরিচালনার সর্বোত্তম পদ্ধতি নির্ধারণে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে।
কমিটি গঠন ও কার্যপরিধি : নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে মন্ত্রণালয়, অর্থ ও আইন বিভাগ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ–এর কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
কমিটির প্রধান দায়িত্ব ছিল: এনসিটি পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মডেল পর্যালোচনা করা, আর্থিক, অর্থনৈতিক ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা, ভবিষ্যৎ কন্টেইনার প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় কার্যকর পরিচালনা পদ্ধতি সুপারিশ করা।
গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ : কমিটি মোট আটটি বৈঠকে বসে বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে। এর মধ্যে ছিল-গত ২৪ বছরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং প্রবৃদ্ধি (গড় ১২.২৮%), বন্দরের আয়–ব্যয়ের ট্রেন্ড, অডিট রিপোর্ট ও হিসাব বিভাগীয় তথ্য, ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এডিবি অর্থায়িত মাস্টার প্ল্যানের তথ্য।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চ, ভিত্তি ও নি¤œ—এই তিনটি প্রবৃদ্ধি ধরা হলেও কমিটি ‘লো কেস’ প্রক্ষেপণকে বাস্তবসম্মত হিসেবে গ্রহণ করে। কারণ ভবিষ্যতে মংলা বন্দর, পায়রা বন্দর এবং সম্ভাব্য গভীর সমুদ্র বন্দর চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের একক চাপ কমে আসবে।
হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ও আর্থিক প্রেক্ষাপট : এনসিটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বন্দরের মোট কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বছরে প্রায় ২৩.৫২ লাখ টিউস-এ পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখা যায়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮ সালকে ভিত্তি বছর ধরে এনসিটিতে প্রায় ৮.৪০ লাখ টিউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং অনুমান করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে ৯ লাখ টিউস-এ স্থিতিশীল থাকবে।
যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা ব্যয়ের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি, বেতন বৃদ্ধি, অবচয় এবং মেরামত ব্যয় বিস্তারিতভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়। মোট ইক্যুইপমেন্ট ক্রয়ব্যয় প্রায় ৯৭০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
পরিচালনার তিনটি প্রধান অপশন : কমিটি এনসিটি পরিচালনার জন্য তিনটি মডেল বিশ্লেষণ করে: অপশন–১: সম্পূর্ণভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থ ও জনবল দিয়ে পরিচালনা করবে।
অপশন–২: ইক্যুইপমেন্ট ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ বন্দর কর্তৃপক্ষ করবে; তবে টার্মিনাল পরিচালনা করবে নিয়োজিত অপারেটর। ট্যারিফ আদায় থাকবে বন্দরের নিয়ন্ত্রণে।
অপশন–৩ (ল্যান্ডলর্ড মডেল): সকল বিনিয়োগ ও পরিচালনা করবে বেসরকারি অপারেটর; ট্যারিফ আদায় করে বন্দরকে রয়্যালটি প্রদান করবে।
বন্দরের শ্রমিক কর্মচারিরা চাই অপশন–৩ (ল্যান্ডলর্ড মডেল) : তবে অপশন–৩ (ল্যান্ডলর্ড মডেল) অনুয়ায়ী এনসিটি পরিচালনার দাবি জানিয়ে আসছে চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক কর্মচারিরা। তারা বলছে, অপশন ২ অনুযায়ী ইক্যুইপমেন্ট ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ বন্দর কর্তৃপক্ষ করলে সেখানে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। সরকারি টাকার অপচয়রোধে অপশন–৩ (ল্যান্ডলর্ড মডেল) অনুয়ায়ী এনসিটি পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আর্থিক বিশ্লেষণের ফলাফল : চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট দ্বারা যাচাইকৃত আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা যায়-অপশন–২ নীট আয়, নীট প্রেজেন্ট ভ্যালু ও পে-ব্যাক পিরিয়ডের বিবেচনায় সবচেয়ে লাভজনক।
অপশন–৩ দক্ষতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করলেও ঝুঁকি বেশি। অপশন–১ তুলনামূলকভাবে কম লাভজনক এবং অধিক জনবলের প্রয়োজন হয়।
আন্তর্জাতিক মডেল পর্যালোচনা : কমিটি ভারতের জওহরলাল নেহেরু পোর্ট ট্রাস্ট, সিঙ্গাপুরের পোর্ট অফ সিঙ্গাপুর অথরিটি এবং শ্রীলঙ্কার শ্রীলঙ্কা বন্দর কর্তৃপক্ষ -এর পরিচালন পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে।
ভারতে ইঙঞ ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের ব্যবহার বেশি। সিঙ্গাপুরে সরকারি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ চলছে। শ্রীলঙ্কায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় মডেলের সমন্বয় দেখা যায়।
কমিটির মতে, এসব দেশের একাধিক বিকল্প বন্দর থাকলেও বাংলাদেশ এখনো মূলত চট্টগ্রাম বন্দরের উপর নির্ভরশীল, তাই সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ঝুঁকি ও কৌশলগত বিবেচনা : প্রতিবেদনে বলা হয়-পুরোপুরি প্রাইভেট অপারেটরের ওপর নির্ভর করলে জাতীয় নিরাপত্তা ও কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিদেশী অপারেটর নির্ভরতা বাড়লে দেশীয় দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ কমে যেতে পারে। বন্দর পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে থাকা জরুরি।
কমিটির সুপারিশ : কমিটি সর্বসম্মতভাবে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরে: অপশন–২ গ্রহণের সুপারিশ-অর্থাৎ যন্ত্রপাতির মালিকানা ও ট্যারিফ নিয়ন্ত্রণ থাকবে বন্দরের কাছে; পরিচালনায় থাকবে অপারেটর। অপশন–২ ও অপশন–৩ এর মধ্যবর্তী একটি মিশ্র মডেল বিবেচনার পরামর্শ, যেখানে: প্রধান কিউ গ্রে গণ্ট্রি ক্রেন বন্দর কিনবে। অন্যান্য ব্যাকআপ ইক্যুইপমেন্ট অপারেটর সরবরাহ করবে। বার্থিং ও ট্যারিফ নিয়ন্ত্রণ থাকবে বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে ধীরে ধীরে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরামর্শ।
কমিটির বিশ্লেষণ বলছে : কমিটির বিশ্লেষণ বলছে, এনসিটি পরিচালনায় দক্ষতা ও আর্থিক লাভ নিশ্চিত করতে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে অপারেটরভিত্তিক পরিচালনা পদ্ধতিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত। এতে একদিকে যেমন সেবার মান উন্নত হবে, অন্যদিকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে কৌশলগত নিরাপত্তাও বজায় থাকবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এনসিটি পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি—এমনটিই উঠে এসেছে প্রতিবেদনের সার্বিক পর্যালোচনায়।