শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা
নাব্য ফেরাতে প্রতি বছর নদী খনন করা হচ্ছে। কিন্তু নাব্য ফিরছে না। কারণ খননের নামে সরকারি কোটি কোটি টাকা নদীতে ঢালা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন অবস্থা পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজীরহাট নৌরুটের।
জানা গেছে, মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া থেকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া নৌপথের পদ্মা নদী এবং মানিকগঞ্জের আরিচাঘাট থেকে পাবনার কাজীরহাট নৌপথের পদ্মা ও যমুনা নদী প্রতি বছর খনন করা হচ্ছে। কিন্তু নদীর মাটি নদীতেই ফেলার কারণে খননের সুফল পাচ্ছেন না নৌযান চালকরা। কারণ নৌপথের খনন করা পলি পাইপ দিয়ে উজানে ফেলার কারণে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে স্রোতের সঙ্গে ফিরে এসে ডুবোচর সৃষ্টি করছে। আবার নৌপথের কিছু পলি অপসারণ করে চরে স্তূপ করে রাখা হলেও বর্ষা মৌসুমে স্রোতের সঙ্গে ফিরে এসে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে প্রতি বছর সরকারি কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ড্রেজিং করা হলেও তেমন কোনো সুফল মিলছে না। ফলে একই নৌপথে প্রতি বছর খনন করা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর বালু নদীতে ফেলার কারণে খনন করে তেমন কোনো লাভ হচ্ছে না। বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে নৌপথ সচল রাখার জন্য খনন করে এলেও ডুবোচরের কারণে বার বার ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বিআইডব্লিউটিসির আরিচা অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতি বছর আরিচা-কাজীরহাট ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথের পলি অপসারণ করে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং ইউনিট। কিন্তু উজানে নদীতেই মাটি ফেলার কারণে কোনো সুফল মিলছে না। বর্ষায় স্রোতে সেই মাটি ফিরে এসে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যায়।
২০২৩ সালে আরিচা-কাজীরহাট, নগরবাড়ী ও বাঘাবাড়ী নৌপথে ছয় কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করে তিন লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হয়। ২০২৪ সালে আরিচা-কাজীরহাট-নগরবাড়ী, মুন্সিখোলা, কৈটোলা-মোহনগঞ্জ-বাঘাবাড়ী নৌপথে তিন কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৮ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হয়। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট আরিচা-কাজীরহাট, বাঘাবাড়ী, আরিচা-কাউলিয়া, সিরাজগঞ্জ নৌপথের খননকাজ শুরু করে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং ইউনিট। নিজস্ব আটটি ড্রেজার দিয়ে এখনও খনন কাজ চলছে। এই কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় চার কোটি ২৫ লাখ টাকা। পলি অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৭ লাখ ঘনমিটার। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে কত লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হবে তার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি এখনও। তবে জরিপ করা হচ্ছে।
আরিচা ঘাটের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, প্রতি বছর খনন কাজ পায় একই প্রতিষ্ঠান। একই প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পলি অপসারণের দায়িত্ব দেওয়া হলে টাকাও অনেক কম ব্যয় হবে। তাছাড়া খনন করা পলিগুলো নদীর মধ্যে না ফেলে সরিয়ে নেওয়া হলে প্রতি বছর এত খনন করতে হতো না।
বিআইডব্লিউটিসির আরিচা অফিসের তথ্যমতে, নৌপথে বড় ফেরি স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে ৯ থেকে ১০ ফুট গভীর পানির প্রয়োজন। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘাট। এখান দিয়েই ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ। কিন্তু পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাট দুটি এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সারাবছরই একটা না একটা সমস্যা লেগেই থাকে। এই নৌপথে বর্ষা মৌসুমে স্রোতের কারণে, শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হয়। শীত মৌসুমে ঘন কুয়াশার কারণেও ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। এ ছাড়া ফেরি স্বল্পতাসহ নানা সমস্যায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে চলাচলকারী দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্বাভাবিকভাবে ফেরি চলাচল করতে না পারায় ঘাট এলাকায় তীব্র যানজট লেগে যায়।
বিআইডব্লিউটিসির আরিচা অফিসের ডিজিএম আব্দুল সালাম বলেন, প্রায় তিন মাস ধরে আরিচা-কাজীরহাট নৌপথে নাব্য সংকটের কারণে প্রায় দুই কিলোমিটার ঘুরে ফেরি চলাচল করতে হচ্ছে। এ নৌপথ সচল করতে এত সময় লাগায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিইটিএ) আরিচা ড্রেজিং ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান আহমেদের ভাষ্য, আরিচা-কাজীরহাট, নগরবাড়ী ও বাঘাবাড়ী নৌপথে বিআইডব্লিউটিএর নিজস্ব আটটি ড্রেজার দিয়ে পলি অপসারণ করা হচ্ছে। এবার এই নৌপথে প্রায় চার কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৭ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হবে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে একটি ড্রেজার দিয়ে পলি অপসারণ করা হচ্ছে। এই নৌপথে পলি অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা এখনও নির্ধারিত হয়নি।