দুর্ঘটনা ঘটলে দায়িত্ব নিবে কে- ঠিকাদার নাকি রেল কর্তৃপক্ষ?
নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : দেশের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থায় গত এক দশকে দুর্বৃত্তায়ন ও অনিয়মের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। এতে জিম্মি হয়ে পড়েছে যাত্রী নিরাপত্তা ও নিরাপদ রেল চলাচলের নিশ্চয়তা। শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক বাংলাদেশ রেলওয়ে-এর সেই অঙ্গীকার-সুবিধাজনক, নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ-আজ বিলুপ্তির মুখে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
রেল একটি ‘গাইডেড ওয়ে’ ভিত্তিক ফিক্সড মোড পরিবহন ব্যবস্থা। এখানে ট্রেনের চাকা নির্দিষ্ট লাইনের ওপর চলাচল করে। ফলে নিরাপদ ও মসৃণ যাত্রা নিশ্চিত করতে রেললাইনকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা অপরিহার্য। এ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে লাইনের বিভিন্ন উপকরণ ও ফিটিংসের পরিবর্তন, সংযোজন ও পরিবর্ধনের কাজ সম্পন্ন করতে হয়। একই সঙ্গে লাইনের ওপর দিয়ে চলাচলকারী ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি প্রতিরোধেও ধারাবাহিক রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, এ কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব রেলওয়ের নিজস্ব প্রশিক্ষিত জনবলের। রেলওয়ে অভিধানে তারা পরিচিত ওয়েম্যান, কি-ম্যান, মেট, হেডমেট ও পিডব্লিউআই (নিয়মিত ওয়ে পরিদর্শক) নামে। মাঠপর্যায়ের এই অভিজ্ঞ কর্মীরা সরাসরি লাইন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পরিচালনা করেন। অন্যদিকে, এ কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পাদিত হচ্ছে কি না তা তদারকি ও নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকেন কর্মকর্তারা। তারা সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী, বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী/ট্র্যাক এবং প্রধান প্রকৌশলী পদবিতে দায়িত্ব পালন করেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অতীতে এ ব্যবস্থাপনা কাঠামো সুস্পষ্ট ও নীতিনির্ভর ছিল।
এ প্রসঙ্গে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন ট্র্যাক সাপ্লাই অফিসার আনহার মাহমুদের স্বাক্ষরিত একটি পত্রের উল্লেখ পাওয়া গেছে। প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষে জারিকৃত ওই চিঠিতে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে কীভাবে রেলওয়ের নিজস্ব জনবল ব্যবহার করতে হবে, তার বিস্তারিত নির্দেশনা সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেই নীতিমালা অনুসরণ নিশ্চিত করা গেলে রেলপথের নিরাপত্তা ও মানোন্নয়ন অনেকটাই সম্ভব। ফলে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে-বাংলাদেশ রেলওয়ে-এর নিজস্ব ‘ওয়ে এন্ড ওয়ার্কস’ ম্যানুয়াল দ্বারা স্বীকৃত পদ্ধতি উপেক্ষা করে কোন আইনি ভিত্তিতে গত এক দশকে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঠিকাদারনির্ভর ব্যবস্থার হাতে তুলে দেওয়া হলো?
অভিযোগের তীর উঠেছে রেল বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিকেই। সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বে থাকা মহাপরিচালক, মহাব্যবস্থাপক, প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী/ট্র্যাক, ট্র্যাক সাপ্লাই অফিসার, বিভাগীয় প্রকৌশলী ও সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলীরা কেন এবং কোন ক্ষমতাবলে রেলওয়ের নিজস্ব প্রশিক্ষিত জনবলকে কার্যত অকার্যকর করে দিয়ে দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম ঠিকাদারদের হাতে ন্যস্ত করলেন-তা নিয়ে জবাবদিহিতার দাবি উঠেছে।
রেলওয়ের দীর্ঘদিনের কাঠামো অনুযায়ী, ওয়েম্যান, কি-ম্যান, মেট, হেডমেট ও পিডব্লিউআইদের মতো প্রশিক্ষিত কর্মীরাই সরাসরি লাইন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন। এই বৃহৎ জনবলকে পাশ কাটিয়ে ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করলে ‘রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়’-এর আড়ালে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এ প্রেক্ষাপটে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে ট্র্যাক সাপ্লাই অফিসার মোহাম্মদ আরিফুর রহমানের স্বাক্ষরিত একটি পত্র পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, পূর্বাঞ্চল রেলপথে প্রায় ২৫ জন ঠিকাদারের মাধ্যমে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান প্রকৌশলী আবু জাফর মিয়া এবং সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আরমান হোসেন। সভায় ৭০টিরও বেশি প্যাকেজের আওতায় চলমান রক্ষণাবেক্ষণ কাজের অগ্রগতি ‘মনিটরিং’-এর কথা উল্লেখ রয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঠিকাদারনির্ভর এই ব্যবস্থায় বাস্তবে রেলপথে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা ও মানোন্নয়নে কতটুকু উন্নতি হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যানভিত্তিক ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেননি। একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়ে গেছে, রেলওয়ের ‘ওয়ে এন্ড ওয়ার্কস’ ম্যানুয়াল অনুসারে নিজস্ব জনবলকে বাদ দিয়ে ঠিকাদারের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ পরিচালনার ক্ষমতাকে, কোন কর্তৃপক্ষ বা কোন বিধান অনুযায়ী প্রদান করেছেন-সে সম্পর্কেও কোনো নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা বা সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে নীতিমালা, ক্ষমতার সীমা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা জরুরি, নতুবা যাত্রী নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের কার্যক্রম মূলত দুই পর্যায়ে সম্পাদিত হতো। প্রথমত, মাঠপর্যায়ে ওয়েম্যান, কি-ম্যান, মেট, হেডমেট ও পিডব্লিউআইরা নিজ নিজ স্টোরে সংরক্ষিত উপকরণ ব্যবহার করে দৈনন্দিন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পরিচালনা করতেন। দ্বিতীয়ত, এসব উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করার জন্য একটি সুসংগঠিত সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর ছিল।
প্রচলিত কাঠামো অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ে-এর প্রধান প্রকৌশলী তার অধীনস্থ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, ট্র্যাক সাপ্লাই অফিসার ও বিভাগীয় প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে মাঠপর্যায়ে ব্যবহৃত (এনেক্সার) এবং চাহিদাপত্রভিত্তিক (স্টোর রিটার্ন) উপকরণের ডিমান্ড ও সাপ্লাই নিরূপণ করতেন। সাপ্লাই চেইন সচল রাখার মাধ্যমে রেলপথের দৈনন্দিন মেরামত কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা ছিল এ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।
উপকরণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতো। নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেই ট্র্যাক-সংক্রান্ত মালামাল সংগ্রহ করা যেত। কোনো প্রতিষ্ঠান রেলপথের উপকরণ উৎপাদনের যোগ্যতা অর্জনের আগে ট্র্যাক সাপ্লাই অফিসারের কাছ থেকে ‘শপ ইন্সপেকশন’ বাধ্যতামূলক ছিল। ওই ইন্সপেকশন রিপোর্ট মহাপরিচালক এর কাছ থেকে অনুমোদিত হওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণের বৈধতা পেত।
এভাবে অনুমোদিত সরবরাহকারীর কাছ থেকে উপকরণ সংগ্রহের পর ট্র্যাক সাপ্লাই অফিসার পুনরায় কারিগরি ও ব্যবহারিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে সন্তোষজনক সনদ প্রদান করতেন। এরপরই উপকরণ মাঠপর্যায়ে পাঠানো হতো এবং রেলওয়ে ম্যানরা তা ব্যবহার করে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। মূলত ট্র্যাক মালামাল সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করাই ছিল ‘টিএসও’-ট্র্যাক সাপ্লাই অফিসার-পদের প্রধান দায়িত্ব। ওই দায়িত্ব পালন না করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সরাসরি ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে এক নজিরবিহীন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রচলিত ম্যানুয়াল ও অনুমোদিত সরবরাহব্যবস্থা পাশ কাটিয়ে ঠিকাদারনির্ভর রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম চালুর এ সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি বা প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ঠিকাদারনির্ভর রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতির সূচনা হয় পূর্বাঞ্চল রেলপথে কর্মরত এক সময়ের প্রধান প্রকৌশলীর আমলে, যিনি বর্তমানে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৯ সালে প্রধান প্রকৌশলী পদে যোগদানের পর থেকেই তিনি রেলওয়ে ম্যানদের সরিয়ে ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণের একটি নতুন ধারা চালু করেন।
এই পরিবর্তনের পক্ষে কোনো লিখিত নথি, আইন, বিধিমালা বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং প্রথম ধাপেই স্টোর রিটার্ন এবং বার্ষিক এনেক্সার প্রদানের পদ্ধতি বিলুপ্ত করা হয়। ফলে মালামালের চাহিদা ও সরবরাহ সংক্রান্ত নথিভিত্তিক রেকর্ড সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা কার্যত উঠে যায়। এতে পরবর্তীতে চাহিদাপত্র ছাড়াই ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
জননিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে শিথিল, উপেক্ষা বা রহিত করার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব ও ভূমিকা সর্বোচ্চ পর্যায়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। তাদের দাবি, এ নীতির ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে অন্যান্য প্রধান প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীরাও একই পথে হেঁটেছেন। এর ফলেই ঘনঘন ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া, চলন্ত অবস্থায় ট্রেন ছিটকে পড়া এমনকি স্টেশন ত্যাগের সময়ও লাইনচ্যুত হওয়ার মতো ঘটনা বাড়ছে। যদিও এসব ঘটনার কারণ নিয়ে পৃথক কারিগরি বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সার্বিকভাবে, ঠিকাদারনির্ভর এ প্রক্রিয়ায় নথিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে যাত্রী নিরাপত্তা ও রেল চলাচলের নির্ভরযোগ্যতাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এরই মধ্যে নতুন করে বড় আকারের প্রকল্প গ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে “বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন” শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১,৭৯১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। প্রকল্পটিতে মো. আহসান উদ্দিন, মো. মনিরুজ্জামান ও মো. আবু জাফর মিয়ার যৌথ স্বাক্ষরের তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রশ্ন উঠেছে-গত এক দশকে ২৫ থেকে ৩০টির বেশি ঠিকাদারের মাধ্যমে যদি রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে, তবে আবার প্রকল্পের মাধ্যমে একই খাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন কেন? বোদ্ধামহলের একাংশের মতে, এটি রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের নামে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পূর্বাঞ্চল রেলপথের ১৫টি সেকশনে ট্র্যাক সুপারস্ট্রাকচার মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যালাস্ট সাবস্ট্রাকচার মেরামতের কোনো সুস্পষ্ট উদ্যোগ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবস্ট্রাকচার উপেক্ষা করে কেবল সুপারস্ট্রাকচার সংস্কার করলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
রাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত বড় অঙ্কের ব্যয় কতটা যৌক্তিক, প্রকল্প প্রণয়নে কারিগরি অগ্রাধিকার সঠিকভাবে নির্ধারিত হয়েছে কি না এবং পূর্ববর্তী রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না-এসব প্রশ্ন এখন সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনায় রয়েছে। বিষয়টি স্বচ্ছ তদন্ত ও কারিগরি পর্যালোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট করা জরুরি বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকরা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে-এর বিধিবিধান অনুযায়ী, রেলপথের দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণ পরিচালিত হওয়ার কথা বিভাগীয় প্রকৌশলী এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে। তার অধীনে সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী , উপ-সহকারী প্রকৌশলী, হেডমেট, মেট, কি-ম্যান ও ওয়েম্যানদের সমন্বয়ে গঠিত ‘গ্যাং’ মাঠপর্যায়ে কাজ করে। প্রতি ৬-৭ কিলোমিটার রেলপথের জন্য একটি গ্যাং দায়িত্ব পালন করে। ট্রলি পরিদর্শনে ত্রুটি শনাক্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে তা মেরামত করা-এটাই ছিল নিয়মিত প্রক্রিয়া। রাবার প্যাড, ইলাস্টিক রেল ক্লিপ, লাইনার, ফিশপ্লেট, ফিশ বোল্ট, ব্যালাস্ট ও স্লিপারের মতো বিশেষায়িত উপকরণ সরবরাহ হতো কেন্দ্রীয়ভাবে প্রধান প্রকৌশলী দপ্তর থেকে, গুণগতমান ও কার্যোপযোগিতা যাচাইয়ের পর।
প্রতিটি সেকশনের ট্র্যাকের অবস্থা বার্ষিকভাবে ‘ট্র্যাক এনেক্সার’-এ লিপিবদ্ধ হতো। কোথায় কতটা ব্যালাস্ট আছে, কোন ফিটিংস অনুপস্থিত, কী পরিমাণ নতুন উপকরণ প্রয়োজন-সব তথ্য থাকত সেখানে। অন্যদিকে, এসএসএই/ওয়ে রা ‘স্টোর রিটার্ন’ হালনাগাদ করতেন, যেখানে মজুত, ইস্যু ও অবশিষ্ট মালামালের হিসাব সংরক্ষিত থাকত। ছয় মাস অন্তর এই হিসাব যাচাই ও প্রতিস্বাক্ষরের নিয়ম রয়েছে।
এই দুই নথিই ছিল চাহিদা নির্ধারণ ও সরবরাহ পরিকল্পনার ভিত্তি। অচল হয়ে গেছে নথিভিত্তিক পলিসি নির্ধারণ প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রকৌশল সূত্রের দাবি, গত প্রায় এক দশকে এনেক্সার ও স্টোর রিটার্ন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ সেকশনে নিয়মিত হালনাগাদ নেই, কোথাও কোথাও ওই দপ্তরে নিয়োজিত এসএসএই রা সে সম্পর্কে জানেও না। প্রধান প্রকৌশলী কিংবা টিএসও দপ্তর থেকেও তদারকিও করা হয় না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমি এই প্রক্রিয়া শুরু করেছি—এ কথা সঠিক নয়। উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমার নাম জড়ানো হচ্ছে। ঠিকাদারনির্ভর এই পদ্ধতি ২০০৬ সাল থেকেই চালু রয়েছে।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে-এর মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেন বলেন, প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী রেলপথের দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগীয় প্রকৌশলীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। তিনি জানান, সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী, হেডমেট, মেট, কি-ম্যান ও ওয়েম্যানদের সমন্বয়ে গঠিত ‘গ্যাং’ মাঠপর্যায়ে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সম্পাদন করে। যেখানে মালামাল সরবরাহের বিষয় থাকে, সেখানে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে গড়পড়তা সব কাজ ঠিকাদার কিংবা প্রকল্পভিত্তিকভাবে সম্পন্ন হয় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে মহাপরিচালক স্বীকার করেন, বর্তমান প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।