দখলদারি অনিয়ম আর চাঁদাবাজির কবলে খুলনা সিটি করপোরেশনের ট্রাক স্ট্যান্ড সংলগ্ন পাইকারি কাঁচা বাজার। চাঁদাবাজির কারণে শোষনের শিকার হচ্ছেন শ্রমিক থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবসায়ীরাও। যার একটা বিরূপ প্রভাব পড়ে বাজার দরেও। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হস্তক্ষেপ করে বাজারকে জিম্মি করে রেখেছে একটি মহল। বাজার মালিক সমিতির নাম দিয়ে হচ্ছে অনিয়ম-দুর্নীতি-চাঁদাবাজি। যার কারণে একদিকে হয়রানি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ আর অন্যদিকে রাজস্ব হারাচ্ছে খুলনা সিটি করপোরেশন। এমনকি মালিক সমিতির রেজিষ্ট্রেশন না করেই চলছে কার্যক্রম।

অভিযোগ রয়েছে, খুলনা মহানগরীর ২৪ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম মঈনুল ইসলাম নাসির এবং তার ঘনিষ্ঠজন নজরুল ইসলাম বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। ৫ আগস্টে সরকার পতনের পর এস এম মঈনুল ইসলাম নাসির রয়েছেন পলাতক। তিনি পলাতক থেকেই নজরুল ইসলাম ও তার সহযোগিদের দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। বর্তমানে নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে চলছে পুরো বাজার সিন্ডিকেট। কেসিসির নামে যানবাহনের কাছে থেকে ১০ টাকা করে টাকা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সে আদায়কৃত অর্থ কেসিসি পাচ্ছে না। প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা চাঁদা তুলে নিজেরা ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছেন। কেসিসির জায়গা দখল করে এ চাঁদাবাজি চলছে প্রায় ১৫ বছর ধরে। ট্রাকস্ট্যান্ডের পাইকারি কাচাবাজারে প্রবেশ সংলগ্ন পথে ভ্রাম্যমান দোকান বসিয়ে সমিতির নামে সিন্ডিকেটটি লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের শ্রমিক সরদার বানিয়ে শ্রমিকদের প্রতিদিন টাকা দিতে বাধ্য করছেন নজরুল গ্রুপ। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতারা পালিয়ে গেলেও ভিন্ন রূপে আবার তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে বাজারে। এছাড়া আড়ৎঘর ভাড়া কিংবা হস্তান্তর করা হলেও মোটা অংকের টাকা দিতে হয় সমিতিকে। নইলে চলে তান্ডব। অন্যদিকে, প্রায় ১৫ বছর ধরে বাজারের ‘উন্নয়ন ফান্ড’ এর নামে প্রতিদিন ৫০ টাকা প্রত্যেক আড়ৎ মালিকের কাছে থেকে আদায় করা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। কিন্তু কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় সমিতির নামে টাকা আত্মসাৎ করেছে চক্রটি। এছাড়া ৪৪ টি অবৈধভাবে গড়ে তোলা দোকান ঘিরে প্রায় কোটি টাকার ওপর বানিজ্য করেছে মঈনুল ইসলাম নাসির ও নজরুল ইসলাম। যা সিটি করপোরেশন পায়নি বিধায় রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে কেসিসি। কেসিসি ও বাজার সূত্রে জানা যায়, বাজারে খুলনা সিটি করপোরেশন কর্তৃক বৈধভাবে বরাদ্দকৃত দোকান ঘর রয়েছে ১৩৬টি। আর অবৈধভাবে আড়ৎ ঘর গড়ে উঠেছে ৪৪টি। ২০০৬ সালের পরবর্তী সময়ে নিরালা থেকে কাঁচা বাজার কেসিসির ট্রাকস্ট্যান্ডের জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। এরপর আওয়ামী লীগের সময়কালে চাঁদাবাজির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয় বাজারটি। তৎকালীন খুলনার সাবেক সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের লোকজন বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন। প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে বাজার কমিটির সভাপতি পদে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা মঈনুল ইসলাম নাসির ও নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে বাজারে একটি গ্রুপ সক্রিয় হয়। এরপর ২০১৬ সালে ও ২০২৩ সালে দুইটি পাতানো নির্বাচন করা হয়। সেখানে নগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নজরুল ইসলামকে সভাপতি ও নাসিরকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। ২০২৬ সালে সেই কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। কিন্তু বাজার সমিতি ট্রেড ইউনিয়নের আওয়াতায় আসলে জবাবদিহিতা শুরু হবে এবং নিয়ন্ত্রণকারীরা ছিটকে পড়ার আতঙ্কে সংশ্লিষ্টরা শ্রম অধিদপ্তরের আওয়াতায় তালিকাভুক্ত করেনি।

সাধারণ ব্যবসায়ীদের কেসিসিতে দেয়া একটি অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কেসিসি পাইকার বাজারে আড়ৎ মালিক সমিতির কোন প্রকার নিবন্ধন ছিল না এবং বর্তমানেও নাই। তা সত্যেও খুলনা সিটি কর্পোরেশন এর অধিনে নির্বাচন হয়েছিল। ৫ আগষ্ট এর পর থেকে ফ্যাসিস্ট কমিটির সাধারণ সম্পাদক সহ একাধিক নেতা চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকায় পালিয়ে গেছে। বর্তমানে নানামুখী বিতর্কীত ও অনৈতিক চাঁদাবাজির কারনে সাধারণ ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের হয়রানি বাড়ছে। এমতাবস্থায় বাজারটি সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করার জন্য একটি আহবায়ক বা পরিচালনা কমিটি একান্ত দরকার। সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলেন, বাজারকে ঘিরে চাঁদাবাজির কারণে একটি প্রভাব পড়ে বাজার দরে। সমিতির নামে বছরে প্রায় বাণিজ্য হয়। যা বন্ধ করা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন এই বাজারে। এছাড়া বাজারের বিভিন্ন একাধিক অভিযোগ আছে। তাও সমাধান হয়নি। অনেকের দোকান দখল করা হয়েছে সমিতির লোকের মাধ্যমে। কিন্তু পাইনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনা সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, এই বাজার ঘিরে অভিযোগের শেষ নেই। কিছু করতে গেলে হাজারো বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। এমনকি কেসিসির সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দু গালিগালাজও শুনতে হয়েছে। ৫ আগস্টের পর আমরা অনিয়মগুলো বন্ধ করতে চেয়েছি। কিন্তু বাজারের শক্তিশালী মাধ্যমে তদবির করিয়েছে। এখন নতুন মেয়র বসলে বিষয়টি সমাধান সম্ভব। বাজারটিকে রাজনীতির বাইরে গিয়ে পরি নইলে অনেক ব্যবসায়ী এই বাজার বিমুখ হয়ে পড়বে। একজন আড়ৎঘর মালিক হুমায়ুন কবির অভিযোগ করে বলেন, বাজারে মেসার্স জোনাব আলী বাণিজ্য ভান্ডার নামে লাইসেন্স আছে। মেসার্স জোনাব আলী বাণিজ্য ভান্ডারটি আমার পিতার নামে ৮২ নং আড়ৎঘর বরাদ্দ হয়। কিন্তু বিগত আড়ৎঘরটি তার নিজ দখলে পায়নি। ৮২ নং আড়ৎঘরটি জনতা বাণিজ্য ভান্ডারের প্রোপ্রাইটার মো. ফারুক জোর করে দখল বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়েছি। আমি সঠিক বিচারের অপেক্ষায় রয়েছি।

বাগেরহাট থেকে আসা ইমদাদ সরদার নামে একজন ব্যবসায়ী বলেন, বাজারে ঢুকে পদে পদে টাকা দিতে হয়। বাধ্য হয়ে দামে বিক্রি করতে হয়। অনেক সময় বেশী দামের কারণে সবজি বিক্রিও হয় না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি প্রয়োজন রেজিষ্ট্রেশনবিহীন কেসিসি পাইকারি কাঁচা বাজার আড়ৎদার মালিক সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, বিগত দিনে নির্বাচন সিটি করপোরেশন থেকে করা হয়েছে। তবে কোনো চাঁদাবাজি হয় না বলে তিনি কথা বলে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে নেয়া হয়। সেখান থেকে ৮০-৯০ হাজার টাকা স্টাফদের বেতন দেয়া হয়। আর কেসিসির ইজিবাইক রাখা বাবদ ১০ টাকা করে নেয়া হয়। কিন্তু তা যারা পাহাড়া দেয় তারাই নিয়ে নেয়।

খুলনা বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপ পরিচালক এস এম ফারুক আহমেদ বলেন, এ ধরনের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের নির্বাচন করি। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষেত্রে রেজিষ্ট্রেশন ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এটা একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রেজিষ্ট্রেশন ছাড়া ট্রেড ইউনিয়ন চালাতে কেউ পারবে না। খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ বলেন, পাইকারি বাজারের বিষয়ে অবগত হয়েছি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হবে। এছাড়া সমিতির কোনো রেজিষ্ট্রেশন না থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করবো।