পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। এ বনে মায়াবি চিত্রা হরিণের অবাধ বিচরণ। তবে বর্তমানে হরিণ নিধনের নেপথ্যে রয়েছে বনরক্ষী আর চোরা শিকারিচক্রের দৌরাত্ম্য। বন জুড়ে তিন শতাধিক প্রজাতির প্রাণিকুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে লাজুক প্রাণী হরিণের। এরা দূর থেকে মানুষের শব্দ পেলেই ঘন বনে লুকোবার চেষ্টা করে। তবু দর্শনার্থীরা সুন্দরবনের বাঁকে বাঁকে, খাল বা নদীর ধারে হরহামেশা দলবেঁধে হরিণের চলাফেরার দৃশ্য দেখতে পান। বনবিভাগের তথ্যমতে, মায়া ও চিত্রা নামের দুই প্রজাতির হরিণ দেখা যায় এ সুন্দরবনে। তবে এর মধ্যে চিত্রা হরিণের সংখ্যাই বেশি।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) জরিপের তথ্যমতে, বর্তমানে সুন্দরবনে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি হরিণ রয়েছে। এর আগে ২০০৪ সালের জরিপে হরিণের সংখ্যা ছিল ৮৩ হাজার।
তবে সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট পরিবেশকর্মীরা বলছেন, জরিপে সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা বাড়লেও শিকার বন্ধ হচ্ছে না। যথেচ্ছভাবে শিকার হচ্ছে সুন্দরবনের মায়াবী বন্যপ্রাণী হরিণ। কিছু অসৎ বন কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের সহায়তায় সারা বছরই সুন্দরবনে হরিণ শিকার করে স্থানীয় চিহ্নিত কিছু চোরা শিকারিচক্র। এসব শিকারীদের ফাঁদে শুধু হরিণই নয় আটকা পড়ছে বন্য শুকর ও বনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাঘও।
বনবিভাগের দেয়া তথ্যে জানা যায়, সম্প্রতি বনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফাঁদে আটকাপড়া এবং জবাই করা হরিণ, হরিণের গোশত-চামড়া, ফাঁদসহ আটক হয়েছেন বেশ কয়েকজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে আটক হরিণ শিকারিদের তথ্যে দেখা গেছে, বনের পাশে যাদের বাড়ি, তারাই বেশি হরিণ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে সুন্দরবন প্রভাবিত খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, বরগুনা এবং বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জের মানুষ বেশি হরিণ শিকারের সাথে জড়িত রয়েছে। এসব উপজেলার গ্রামগুলোতে বেশির ভাগই শ্রমজীবী মানুষের বসবাস। তাদের প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ সুন্দরবনকেন্দ্রিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব ও পশ্চিম-এ দুই প্রশাসনিক বিভাগে সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশ বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন। আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন।
সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, একশ্রেীণর চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্যে হুমকির মুখে সুন্দরবনের প্রাণিসম্পদ। সুন্দরবন-সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে চিহ্নিত কিছু চোরা শিকারি ও বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্র। এদের কেউ কেউ বংশপরম্পরায় সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী শিকারে জড়িত। এসব বন অপরাধী চক্রের রয়েছে গডফাদার। তাদের কেউ কেউ চলেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়।
বনসংলগ্ন গ্রামবাসী জানান, উৎসব আসলেই সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় হরিণের গোশতের চাহিদা বেড়ে যায়। অবৈধ জেনেও হরিণের গোশত কেনেন অনেক মানুষ। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা হরিণের গোশত দিয়ে উৎসব পালন করেন। এ সময় বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে স্থানীয় চোরা শিকারিচক্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সুন্দরবনে দেড়শ’রও অধিক চোরাশিকারি চক্র সক্রিয়। এসব পেশাদার শিকারিরা জেলের ছদ্মবেশে মাছ ধরার জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে বনে যান। বনের ভেতরেই সেই দড়ি দিয়ে হরিণ ধরার ফাঁদ তৈরি করে হরিণের যাতায়াতের পথে পেতে রাখেন। চলাচলের সময় প্রাণীগুলো সেই ফাঁদে আটকা পড়ে। পরে বনের ভেতরে মাংস কেটে লোকালয়ে এনে বিক্রি এবং স্থানীয় পদ্ধতিতে চামড়া, মাথাসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে পাচার করা হয়। শিকার শেষে ফিরে যাওয়ার সময় ফাঁদগুলো বস্তায় ভরে জঙ্গলের ভেতর মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। সময়-সুযোগ মিললে তারা আবার শিকারে আসেন। এসব শিকারিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে এজেন্ট-ব্যবসায়ীদের। এই এজেন্টদের মাধ্যমে কখনো অগ্রিম অর্ডার, আবার কখনো গোশত এনে তারপর বিক্রি করা হয়। এই চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায় হরিণের গোশত। ক্রেতারাও অনেক সময় প্রতারণা ভেবে হরিণ নিজ চোখে না দেখে গোশত কিনতে চান না। চোরাশিকারিরা তখন জীবন্ত হরিণ লোকালয়ে এনে জবাই করেন অথবা হরিণের চামড়া সহ গোশত এনে দেখাতে হয়। সুন্দরবন-সংলগ্ন জনপদে সারা বছরই হরিণের গোশতের চাহিদা রয়েছে। উৎসব-পার্বণ ছাড়াও কেউ কেউ স্বজনদের হরিণের গোশত উপহার দেন। আবার বড় ধরনের স্বার্থসিদ্ধির জন্যও কর্তাব্যক্তিদের খুশি করতে গোপনে হরিণের গোশত সরবরাহ করা হয়। হরিণের চামড়া-শিং সৌখিন ব্যক্তিরা সংগ্রহ করে ড্রইং রুম সাজিয়ে রাখে।
সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের গোশত ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় পাওয়া যায়। তবে জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের গোশের দাম ১০০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। আর আস্ত একটি জীবিত হরিণের দাম চাওয়া হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবনে বাঘের প্রধান খাবার হরিণ শিকার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। স্থানীয় চিহ্নিত কিছু চোরা শিকারিচক্র সারা বছরই এই অনৈতিক কাজে জড়িত।
শুভ্র শচীন আরো বলেন, যে পরিমাণ হরিণের গোশত ও চামড়া আটক হয়, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি পরিমাণ হরিণ শিকার করা হয়। মাঝে মধ্যে দুই একটি অভিযানে হরিণের গোশত, চামড়া, মাথা উদ্ধার হলেও মূল চোরাশিকারি ও পাচারকারী আটক হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হরিণের গোশত বহনকারীরাই ধরা পড়ে। আর যারা আটক হন, তারা দুর্বল আইনের কারণে কয়েকদিন পর জেল থেকে ফিরে একই কাজে লিপ্ত হন। তবে অপরাধ দমনে শুধু টহলই যথেষ্ট নয়, বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানও তৈরি করা জরুরি।
এ ব্যাপারে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বন অপরাধ দমনে বন বিভাগ সবসময় তৎপর রয়েছে। সুন্দরবনের হরিণসহ বন্যপ্রাণী রক্ষায় বন রক্ষীরা নতুন নতুন পদ্ধতিতে টহল দিচ্ছে, যাতে প্রাণীকুলসহ বনের সকল সম্পদ রক্ষা করা যায়। সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানিয়েছেন, ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণ শুরু হয়েছে। মৌয়ালরা এখন সুন্দরবনে। দুই মাস ধরে চলবে মধু আহরণ।
তিনি বলেন, একশ্রেণির অসাধু লোকজন সুন্দরবনের সম্পদ লুণ্ঠনের চেষ্টা চালায়। বনজসম্পদ রক্ষা, হরিণসহ বন্যপ্রাণী শিকার প্রতিরোধে বিশেষ সতর্কতা ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, জনবল সংকটসহ বেশকিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সুন্দরবন কেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছেন বন কর্মকর্তা ও বনের প্রহরীরা।