বৃহত্তর খুলনা জেলার নদ-নদীতে মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন কমে যাচ্ছে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর পানির দূষণ বৃদ্ধি, অতিরিক্ত মাছ ধরা, বেড়িবাঁধ দিয়ে লবণ পানির প্রবেশ বন্ধ করে ধান ও শাকসবজি চাষ করা, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাসসহ পানি কমে যাওয়ার কারণে নদীতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বৃদ্ধির পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া অবাধে নৌযান চলাচল এবং বিষ প্রয়োগ ও পাটাজাল দিয়ে মাছ ধরার কারণেও সুন্দরবন উপকূলের নদ-নদীতে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
বৃহত্তর খুলনা জেলার নদনদীর মাছের প্রধান উৎসস্থল সুন্দরবন। সুন্দরবনে প্রায় ৪৫০টি নদ-নদী ও খাল রয়েছে। এই সব নদনদী ও খালে প্রায় ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৩ প্রজাতির কাকড়া, ৪৩ প্রজাতির মালাস্কা ও এক প্রজাতির লবস্টার রয়েছে। উল্লেখযোগ্য মাছের মধ্যে রয়েছে-ভেটকি, রূপচাঁদা, দাঁতিনা, চিত্রা, কাইন মাগুর, কাইন মাগুর, পাঙাশ, লইটা, ছুরি, পারসে, ইলিশ, জাভা, ভাঙ্গন, ফাইশ্যা, টেংরা, পোয়া, তপসে এবং বাগদা চিংড়ি। সুন্দরবনের নদ-নদী ও খাল থেকেই বৃহত্তর খুলনা জেলার (খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা) নদনদী ও খালে প্রাকৃতিকভাবে মাছ প্রবেশ করে থাকে।
মৎস্য অধিদপ্তরের সূত্র মতে, বাংলাদেশের শতকরা ৮০ শতাংশ মাছই উৎপাদন হয় বৃহত্তর খুলনা জেলার নদ-নদী ও খালে। এ সব মাছের প্রধান উৎপাদনস্থল সুন্দরবন কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীতে মাছের খাদ্য ও অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যাচ্ছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণেও আর আগের মত নদনদীতে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অসাধু জেলেদের নদ-নদীতে বিষ প্রয়োগ এবং পাটাজাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে বিভিন্ন প্রজাতির মাছসহ অন্যান্য জলজপ্রাণী মারা যাচ্ছে। পাশাপাশি মাছের পোনাও ধবংস হচ্ছে। ফলে দিনদিন নদ-নদীতে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এছাড়া নদী গুলোতে নৌযান চলাচল বৃদ্ধির কারণে দূষণের মাত্রা বেড়েছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে মাছের প্রজননে। এছাড়া নদীর নব্য কমে যাবার কারণেও জেলেদের জালে আর আগের মত মাছ ধরা পড়ছে না। অন্যদিকে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চল হচ্ছে লবণাক্ত এলাকা। নদ-নদীতে বাঁধ দেয়ার কারণে লবণ পানি উঠতে না পারায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে বলে মৎস্য অধিদপ্তর মনে করছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের সূত্র মতে, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে শুধুমাত্র খুলনা অঞ্চলের উৎপাদিত হিমায়িত বাগদা চিংড়ি রফতানি করে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫৮ মার্কিন ডলার, হিমায়িত গলদা চিংড়ি রফতানি করে ২০ কোটি ৮২ লাখ ২৭ হাজার ৮০১ মার্কিন ডলার ও হিমায়িত সাদা মাছ রফতানি করে ৮ লাখ ৯৪ হাজার ১৯২ মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। এছাড়া কুইচা ও কাকড়া রফতানি করে ১৮ লাখ ৬৪ হাজার ৬৭৬ মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। তবে, খুলনা জেলায় চিংড়িসহ মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাধারণ জেলেদের অভিযোগ কিছু অসাধু জেলে সুন্দরবনের নদনদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার পাশাপাশি কঁকড়া শিকার করেন। এই বিষ প্রয়োগের কারণে মাছের পাশাপাশি রেণুও মারা যাচ্ছে। যার কারণে জোয়ারের সময় নদ-নদীতে আর আগের মত মাছ প্রবেশ করছে না। ফলে নদী গুলো দিন দিন মাছ শূন্য হয়ে পড়ছে।
সুন্দরবন সংলগ্ন দাকোপ উপজেলার কালাবগী গ্রামের জেলে সালাম মোল্যা নদীতে মাছ কমে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অসাদু জেলেরা সুন্দরবনে প্রবেশ করে বিষ প্রয়োগ করে খেপলা জাল দিয়ে মাছ ধরেন।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী প্ররিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় সুন্দরবনে প্রবেশ করে বিষ দিয়ে মাছ ধরার পাশাপাশি কাঁকড়া শিকার করেন, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীর মাছের ওপরেও।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় সিনিয়র সহকারী পরিচালক (সাবেক) মো. মনিরুল মামুন বলেন, মাছের প্রধান বিচ সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে বৃহত্তর খুলনা জেলার নদ-নদীতেও মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন মৎস্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সুন্দরবন বন বিভাগ যৌথ ভাবে কাজ করলে মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হতে পারে।