দেশের দুর্গম ও অনুন্নত দুটি গ্রামের নাম বাঁশতলা ও লতাবুনিয়া। খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়নের পশ্চিম সীমান্তে গ্যাংরাইল ও ভদ্রা নদীর মোহনায় জেগে ওঠা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে অবস্থিত গ্রাম দুটি। ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতি বিপর্যয়ের কারণে সমগ্র মূলধারার উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে আছে অঞ্চলটি। বিদ্যুতে আলোকিত হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার নেই কোনো উন্নতি। একমাত্র বাঁশের সাঁকোই যেন গ্রামবাসীর ভরসা।

এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, ডুমুরিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে সাহস ইউনিয়নে অবস্থিত লতাবুনিয়া ও বাঁশতলা নামক গ্রাম দুটি। গ্যাংরাইল ও ভদ্রা নদীর মোহনায় শত বছরের আগে জেগে ওঠা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বর্তমান ৬ শতাধিক পরিবারের বসবাস। সেখানে পারাপারের নেই কোনো সু-ব্যবস্থা। ভদ্রা নদীতে জরাজীর্ণ ১টি বাঁশের সাঁকোই তাদের একমাত্র ভরসা। বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করা গর্ভবতী মায়েদের বিশেষ মুহূর্তে বিপাকে পড়তে হয়। তেমনি কমলমতি শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে সাঁকো। ইতঃপূর্বে অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে যেতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। ভারি কোনো পণ্য পার করতে হলে নৌকা-ডিঙিতে পারাপার করতে হয়। এভাবে অন্তহীন দুর্বিষহ জীবন-যাবন তাদের দীর্ঘদিন থেকে। মূলত ৫/৭ বছর আগে ভদ্রা নদী খননের পর থেকে গ্রাম দু’টি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরপর উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের অর্থায়নে লতাবুনিয়া ও বাশতলা গ্রামে দুটি বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়। কিন্তু প্রত্যেক বছর সাঁকো নড়বড়ে হয়ে পড়ে। বর্তমানে চরম অবহেলা অব্যবস্থাপনায় নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে সাঁকো দুটি।

লতা গ্রামের গৃহবধূ পম্পী মন্ডল জানান, “এত অনুন্নত এলাকা মনে হয় বাংলাদেশের আর কোথাও নেই! আমাদের গ্রামে ভালো কোনো রাস্তা নেই। কোথাও পাকা ইটের সলিং নেই। যুগের পর যুগ চরম কষ্টের মধ্যে বসবাস করে আসছে লতাবুনিয়া গ্রামের মানুষ। এর চেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার আর কী হতে পারে?” তিনি বলেছেন, “দেশের উন্নয়নের ছোঁয়া যদি এ অঞ্চলে কিছুটা পড়তো তা হলে এলাকায় অনেক উন্নয়ন হতো, বাঁশের সাঁকোতে হয়ত আর নদী পার হতে হতো না।”

স্থানীয় দীনবন্ধু মন্ডল ও শিক্ষক সুশিল কুমার বালা জানান, “এলাকাটি চরম অবহেলিত। আইলার ঘুর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্রামের রক্ষাবাঁধের। তখন সব তলিয়ে একাকার হয়েছিল। সেই থেকে চরম দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে এলাকার মানুষ। এখানকার মানুষের পারাপারের একমাত্র উপায় বাঁশের সাঁকো। যা বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ।” তারা আরও বলেন, “২০২১ সালে ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে এলজিইডি’র মাধ্যমে লতাবুনিয়া ও বাশতলা গ্রামের চতুর্পাশে রক্ষাবাঁধ দেওয়া হয়। এ বাঁধ আরও উঁচু না করলে আবারও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করা যাচ্ছে।” স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মোল্যা মাহাবুবুর রহমান জানান, “একেবারেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গ্রাম দুটি। কয়েকবার ব্যক্তিগতভাবে সাঁকো মেরামত করে দিয়েছি। এছাড়া গ্রামের চার পাশে নদী। সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয় তাদের। কিছুদিন আগে থানা ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে ওই অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। একটা ব্রিজ করে দিবেন বলেছেন।” এ ব্যাপারে ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ দারুল হুদা জানান, “কিছুদিন আগে গ্রাম দুটি পরিদর্শন করেছি। এলাকার মানুষ চরম ভোগান্তিতে রয়েছে। এবার উপজেলা থেকে প্রথম প্রপোজাল (প্রস্তাব) যাবে লতাবুনিয়ার ভদ্রা নদীতে ব্রিজ স্থাপনের। ওখানে ব্রিজ হলে পরিবহনের মাধ্যমে ব্যাবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন গ্রাম দু’টি মূল ভূখ-ের সাথে যুক্ত হবে।”