হুসাইন বিন আফতাব, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরে এক সময় গ্রাম বাংলার চিরচেনা দৃশ্য ছিল মাটির ঘর। সবুজ গাছপালায় ঘেরা উঠান, পাশে পুকুর, আর মাঝখানে শীতল ও আরামদায়ক মাটির তৈরি বসতঘর—এই ছিল গ্রামীণ জীবনের সহজ সরল পরিচয়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আধুনিকতার প্রভাবে সেই ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
এক সময় গ্রামাঞ্চলে মাটির ঘরকে বলা হতো “গরিবের এসি বাড়ি”। কারণ গরমে এসব ঘর থাকত ঠা-া, আবার শীতকালে ভেতরটা থাকত তুলনামূলক উষ্ণ। ফলে গ্রামীণ মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য মাটির ঘরকেই সবচেয়ে উপযোগী বলে মনে করতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই মাটির ঘরের জায়গা দখল করে নিচ্ছে ইট, বালি, সিমেন্ট ও রড দিয়ে তৈরি পাকা দালান কিংবা আধাপাকা ঘর।
শ্যামনগরের ১২টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক দশক আগেও যেখানে অধিকাংশ বাড়ি ছিল মাটির তৈরি, এখন সেখানে চোখে পড়ে পাকা দালান বা ইটের দেয়াল দিয়ে তৈরি টিনশেড ঘর। মাটির ঘর এখন হাতে গোনা কয়েকটিতে সীমাবদ্ধ।
স্থানীয়রা জানান, প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে মাটির ঘরের প্রচলন ছিল। আঠালো এটেল মাটি কাদা করে দুই থেকে তিন ফুট চওড়া দেয়াল তুলে ঘর তৈরি করা হতো। প্রায় ১০ থেকে ১৫ ফুট উঁচু দেয়ালের ওপর বাঁশ বা কাঠের সিলিং তৈরি করে তার ওপর খড়, টালি কিংবা টিনের ছাউনি দেওয়া হতো। অনেক সময় এসব ঘর দোতলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হতো। একটি মাটির ঘর তৈরি করতে দক্ষ কারিগরদের তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত সময় লাগত।
শুধু বসবাসের জায়গা হিসেবেই নয়, মাটির ঘর ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতি ও নান্দনিকতারও অংশ। গৃহিণীরা দেয়ালে রঙিন মাটি বা সাদা খড়ি দিয়ে আলপনা এঁকে ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলতেন। ফলে এসব ঘর গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত ছিল।
শ্যামনগরের কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা জানান, উপকূলীয় অঞ্চলে আগে মাটির ঘরই ছিল মানুষের প্রধান আশ্রয়। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রচ- গরমে এসব ঘর তুলনামূলক আরামদায়ক ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, রুচি ও চাহিদা বদলে গেছে। এখন অধিকাংশ মানুষ নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব এবং আধুনিক সুবিধার কথা চিন্তা করে পাকা ঘর নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছেন।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “আগে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মাটির ঘর ছিল। এখন খুব কম দেখা যায়। অনেকেই পুরোনো মাটির ঘর ভেঙে পাকা দালান বা ইটের ঘর তৈরি করছেন।”
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, যাদের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে তারা পাকা ভবন নির্মাণ করছেন। আবার অনেক পরিবার পুরোপুরি পাকা বাড়ি করতে না পারলেও ইটের দেয়াল তুলে তার ওপর টিনের ছাউনি দিয়ে আধাপাকা ঘর তৈরি করে বসবাস করছেন।
স্থানীয়দের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার ঝুঁকি বেশি থাকায় অনেকেই মাটির ঘরকে অনিরাপদ মনে করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাটির ঘর সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় মানুষ এখন ইট-সিমেন্টের ঘর নির্মাণকে বেশি নিরাপদ মনে করছেন।
এছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিদেশে কর্মসংস্থান, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ, মাছ ধরা কিংবা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হওয়ায় তাদের বসতবাড়িতেও পরিবর্তন এসেছে। নতুন আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো মাটির ঘর ভেঙে আধুনিক দালান নির্মাণের প্রবণতা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির ঘর শুধু একটি বসতবাড়ি নয়, এটি গ্রামীণ ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।
গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবনধারার প্রতীক এই মাটির ঘর এখন সময়ের পরিবর্তনে বিলুপ্তির পথে। হয়তো খুব বেশি দিন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গ্রামবাংলার সেই শীতল, নান্দনিক মাটির ঘরকে দেখবে শুধু গল্প, সাহিত্য কিংবা জাদুঘরের প্রদর্শনীতে।