স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুরঃ

দীর্ঘদিনের উচ্ছেদ-পুনর্দখলের চক্র ভেঙে অবশেষে গাজীপুর মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ জয়দেবপুর রেলগেট এলাকা আবারও দখলমুক্ত করা হয়েছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় প্রশ্ন উঠেছে-এই দখলমুক্ত অবস্থা কতটা স্থায়ী হবে।

এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে শুরু করে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই পুনরায় দখল হয়ে যায় জয়দেবপুরের ওই রেলগেট এলাকা। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ শওকত হোসেন সরকারের নির্দেশনায় পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানও আংশিক অবস্থায় শেষ হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টা না পেরুতেই ফের দখলে চলে যায় রেলগেট ও রেলক্রচিং এলাকা। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ে।

এরই প্রেক্ষিতে বুধবার (১ এপ্রিল) নতুন করে কঠোর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন ও রেলওয়ের সমন্বয়ে পরিচালিত এ অভিযানে সম্পূর্ণভাবে দখলমুক্ত করা হয় এলাকা, সরিয়ে দেওয়া হয় অবৈধ দোকানপাট, হকার ও অস্থায়ী স্থাপনা।

অভিযান প্রসঙ্গে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ শওকত হোসেন সরকার বলেন, 'গাজীপুরকে একটি পরিচ্ছন্ন, দখলমুক্ত ও বাসযোগ্য ‘গ্রীন সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। উচ্ছেদের পর পুনরায় দখল রোধে কঠোর নজরদারি, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'

তিনি আরও বলেন, 'এটি একদিনের অভিযান নয়-ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমরা চাই, এই এলাকা স্থায়ীভাবে শৃঙ্খলার মধ্যে থাকুক এবং নগরবাসী নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।

এদিকে, দখলমুক্ত অবস্থা স্থায়ী করতে নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সোহেল হাসান। তিনি বলেন, 'এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি যেন আর কখনো অবৈধ দখলে না যায়, সে জন্য আমরা গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন এবং রেলওয়ের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছি। এই টিম মোবাইল ইউনিট হিসেবে অন্তত আগামী এক মাস ধারাবাহিকভাবে মাঠে থাকবে এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিং করবে, যাতে কেউ নতুন করে দোকানপাট বসাতে বা দখল নিতে না পারে।

তিনি আরও জানান, 'আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরিমানা ও অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা শুধু উচ্ছেদ করেই থেমে থাকছি না-এটি যাতে কার্যকরভাবে টিকে থাকে, সেটিই এখন মূল লক্ষ্য।'

সৌন্দর্যবর্ধন ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা নিয়েও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন,

'এই জায়গাটিকে দৃষ্টিনন্দন ও জনবান্ধব একটি উন্মুক্ত নগর স্পেসে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এমন উন্নয়ন করা হবে, যাতে এটি জনগণের উপকারে আসে এবং ভবিষ্যতে আর কোনোভাবেই দখলদারদের কবলে না পড়ে।'

স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন পর দখলমুক্ত পরিবেশ ফিরে পাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করলেও তারা সতর্ক করে বলেছেন, 'আগেও বহুবার উচ্ছেদ হয়েছে, কিন্তু স্থায়ী হয়নি। এবার যদি টাস্কফোর্স কার্যকর থাকে এবং নিয়মিত নজরদারি চলে, তাহলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব।'

অন্যদিকে উচ্ছেদ হওয়া ভাসমান ব্যবসায়ীরা জীবিকার প্রশ্ন তুলে পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

জয়দেবপুর রেলগেট-যা একসময় গাজীপুরবাসীর ‘গলার কাঁটা’ হিসেবে পরিচিত ছিল-সেই এলাকাকে দখলমুক্ত করার সর্বশেষ এই উদ্যোগ এখন নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। টাস্কফোর্স, নিয়মিত মনিটরিং এবং কঠোর আইন প্রয়োগ-এসব ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে এই সাফল্য স্থায়ী হবে কিনা।