সুন্দরবনের ডলফিন সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত ১৩ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট দুইটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় যেসব বনজীবী ও জেলে পরিবারকে বিকল্প কর্মসংস্থানে যুক্ত করার কথা ছিল, তারা এখনো সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল রয়ে গেছে।

প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ইরাবতি ডলফিন সাধারণত লবণ পানিতে এবং গাঙ্গীয় ডলফিন মিষ্টি পানিতে বসবাস করে। তবে সুন্দরবন পৃথিবীর একমাত্র অঞ্চল যেখানে এই দুই প্রজাতির ডলফিনকে একই আবাসস্থলে একসঙ্গে দেখা যায়। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই ডলফিন সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে ইউএনডিপি বনজীবীদের বিকল্প জীবিকায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে ১৩ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয়। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বন বিভাগ ও দুইটি এনজিওর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়।

কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (ঈঙউঊঈ)-এর প্রোগ্রাম অর্গানাইজার জয়নাল আবেদিন জানান, চাঁদপাই রেঞ্জের দুইটি ডলফিন অভয়ারণ্য এলাকায় প্রায় এক হাজার মানুষকে ডলফিন সেঞ্চুরির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বিকল্প জীবিকার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। তার ভাষ্যমতে, প্রত্যেক পরিবারকে গড়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকার সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল।

তবে প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের বক্তব্য ভিন্ন। অনেকেই জানান, তারা এখনো অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। স্থানীয় এক জেলে বলেন, ডলফিন সংরক্ষণ প্রকল্প থেকে তাকে একটি ভ্যান দেওয়া হলেও সেটি মানসম্মত ছিল না। পরে সেই ভ্যান বিক্রি করে তিনি একটি ট্রলার ও জাল কিনে আবার মাছ ধরায় ফিরে যান। আরেকজন সুবিধাভোগী জানান, ভ্যানগাড়িটি ব্যবহারের এক পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায় এবং ব্যাটারি কেনার সামর্থ্য না থাকায় তিনি সেটি বিক্রি করতে বাধ্য হন।

ডলফিন সংরক্ষণ দলের একাধিক সদস্য অভিযোগ করে বলেন, বন বিভাগের সহায়তায় এনজিও কর্তৃপক্ষের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এই বিপুল অর্থ ডলফিন সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাঠপর্যায়ে যারা প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের গাফিলতি, স্বজনপ্রীতি এবং অনিয়ম প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করেছে। একজন বনজীবী বলেন, জীবনের বাস্তবতা আগের চেয়েও কঠিন হয়ে উঠেছে-অনেক সময় এক বা দুই বেলা খাবার খেয়েই দিন কাটাতে হচ্ছে।

তবে ইউএনডিপির অর্থায়নে পরিচালিত এপাসি প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প কর্মকর্তা এবং বর্তমানে পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করীম চৌধুরী ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তিনি জানান, প্রত্যেক পরিবারকে ৫০০ ডলারের সমপরিমাণ বাংলাদেশি টাকা প্রদান করা হয়েছিল এবং তাদের দোকান ব্যবসা, কাঁকড়া চাষসহ বিভিন্ন বিকল্প জীবিকায় যুক্ত করা হয়। তার দাবি অনুযায়ী, এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই প্রায় ১৭ শতাংশ উপকারভোগীর আয় বৃদ্ধি পায় এবং অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো ৫০ হাজার টাকার বেশি আয়ের মুখ দেখেন।

এদিকে ডলফিন সংরক্ষণে বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বনজীবী ও স্থানীয়রা।