কখনো ভারতের সন্ত্রাসী খাসিয়া কর্তৃক আবার কখনো বিএসএফ সদস্য কর্তৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশীদের হতাহতের খবর পাওয়া যায় অহরহ। যত সময় যাচ্ছে সিলেট বিভাগের সকল সীমান্ত পথ যেন অনিরাপদ হয়ে উঠছে। সীমান্তবাসীদের মধ্যে দিনে কিংবা রাতে উদ্বেগ উৎকন্ঠা বিরাজ করছে। জান ও মালের নিরাপত্তার জন্য উদ্বীগ্ন রয়েছেন সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষজন। শুধু পতাকা বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিশিষ্টজনরা জানিয়েছেন তীব্র প্রতিক্রিয়া। সীমান্তবাসীরা এসব হত্যাকা-ের ব্যাপারে আতঙ্কিত থাকলেও মুখ খুলতে নারাজ।
সিলেটের সীমান্ত পথগুলোকে খুবই নিরাপদ রুট হিসেবে দীর্ঘদিন থেকে ব্যবহার করে আসছে চোরাকারবারিরা ও মাদক ব্যবসায়ীরা। চিনি, পেয়াজ, গরু, মহিষ, কসমেটিকস, সার, বিড়ির পাশাপাশি ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য অবৈধভাবে আসছে ভারত থেকে। তার সাথে রয়েছে অস্ত্র কিন্তু চুন থেকে পান খসলেই বা ভূলক্রমে বাংলাদেশের নিরীহ মানুষ ভারতে ঢুকে গেলে গুলী করে হত্যা করে সন্ত্রাসী খাসিয়ারা। পরে লাশ পাওয়া যায় সীমান্তের ওপারের লোকালয় কিংবা জঙ্গলে। আবার লাশ আনতে বিএসএফ করে অপদস্ত ও হয়রানী।
গত ১৯ ডিসেম্বর শুক্রবার বিকেলে সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ এলাকায় বরমসিদ্ধিপুর সীমান্তে ভারতীয় খাসিয়া আদিবাসীদের গুলীতে বাংলাদেশী ২ যুবক নিহত হয়েছে। একই সাথে আহত হয়েছে আরেক যুবক। নিহতরা হলেন কোম্পানীগঞ্জের পূর্ব তুরং এলাকার আশিকুর রহমান ও একই ইউনিয়নের বরমসিদ্ধিপুর গ্রামের মো. ইয়াকুব উদ্দিন। এসময় পূর্ব তুরং এলাকার মোশাঈদ নামে একজন গুরুতর আহত হন।
নিহতদের পরিবারের সদস্যরা জানান, শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে আশিকুর ও মোশাঈদ তুরং সীমান্ত এলাকায় গেলে, তাদের লক্ষ্য করে সীমান্তের ওপার থেকে তিন রাউন্ড গুলী ছোড়ে ভারতীয় খাসিয়া আদিবাসীরা। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় আশিকুর রহমানের। আহত মোশাঈদ সেখান থেকে পালিয়ে আসে। এর ঘণ্টাখানেক পর বরমসিদ্ধিপুর সীমান্ত এলাকায় যায় ইয়াকুব উদ্দিন। তাকে লক্ষ্য করেও গুলী ছোড়ে খাসিয়ারা। বেশ কয়েকটি গুলী তার গায়ে লাগে। পরে স্বজনরা গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
এদিকে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিএসএফের একটি দল প্রবেশ করে কৃষকদের ক্ষেত নষ্ট করার ঘটনা ঘটে। জানা যায়, গত ২ নভেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে কৃষকদের ফসল রক্ষায় দেওয়া খুঁটি উপড়ে ফেলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) একটি দল। বিষয়টি দেখে স্থানীয় লোকজন প্রতিবাদ জানান। দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিত-ার এক পর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা একটি স্পিডবোটে সীমান্ত এলাকা ছেড়ে যান। জকিগঞ্জের মানিকপুর ইউনিয়নের রসুলপুর সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে বিজিবি বিএসএফকে ডেকে এনে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশের ঘটনায় প্রতিবাদ জানায়। আবার যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সে ব্যাপারে বিএসএফকে সতর্ক করা হয়েছে।
সিলেটের কানাইঘাটের লোভাছড়া সীমান্তে ভারতীয় খাসিয়ার গুলীতে জামাল উদ্দিন নামে এক বাংলাদেশী যুবক গত ২২ নভেম্বর শনিবার নিহত হয়েছেন। ওইদিন রাতে লোভাছড়া সীমান্ত এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত জামাল উদ্দিন কানাইঘাট উপজেলার কান্দলা (বাংলাটিলা) গ্রামের মৃত মকরম আলীর ছেলে। জামাল উদ্দিন শনিবার দুপুরে ভারতের অভ্যন্তরে সুপারি আনতে গেলে খাসিয়াদের গুলীতে গুরুতর আহত হন। এ অবস্থায় জামাল উদ্দিনের সঙ্গীরা তাকে বাংলাদেশের হাফারমুখ এলাকায় নিয়ে আসলে তিনি মারা যান।
সীমান্তবর্তী কানাইঘাট লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের দনা সীমান্তে ভারতের অভ্যন্তরে অস্ত্রধারী খাসিয়াদের গুলীতে শাকিল আহমদ (২৫) নামে এক বাংলাদেশী যুবক নিহত হয়েছেন। গত ২৬ অক্টোবর রোববার বিকালে দনা সীমান্তবর্তী ১৩৩৪নং মেইন পিলারের ভারতের ৩শ গজ ভেতরে এ ঘটনা ঘটে। সীমান্তবর্তী দনা পাতিছড়া গ্রামের আব্দুর রউফের ছেলে শাকিল আহমদসহ আরও দুই জন দনা সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের দনা খাসিয়া পুঞ্জিতে প্রবেশ করে সুপারি পাড়তে যায়। সে সময় অস্ত্রধারী খাসিয়ারা তাদের উপর গুলী করলে শাকিল আহমদ গুলিবিদ্ধ হয়। গুলীবিদ্ধ অবস্থায় তাকে তার সহযোগীরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসেন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তিনি মারা যান।
সেই সাথে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ডোনা সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলীতে গত ২৯ আগস্ট শুক্রবার রাতে আব্দুর রহমান (২৫) নামের এক যুবক নিহত হন। তিনি কানাইঘাট উপজেলার আটগ্রাম বড়চাতল (বাকুরি) গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে। এঘটনায় আহত হয়েছেন আরও চারজন। আহতরা হলেন- জামিল আহমদ, হুসেন আহমদ, আয়নুল হক এবং জুমিল আহমদ। শুক্রবার রাতে কয়েকজন যুবক নিহত আব্দুর রহমানসহ কয়েকজন মহিষ আনতে গেলে বিএসএফ জওয়ানরা তাকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলী ছুড়লে ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়।
অপরদিকে, সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া সীমান্তে ভারতীয় খাসিয়াদের গুলীতে সাহেদ মিয়া (২৫) নামের এক বাংলাদেশী যুবক নিহত হয়েছেন। গত ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার রাত ৩ টার দিকে ভারতের অভ্যন্তরে খাসিয়াদের চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত দুই গ্রুপের আধিপত্যের দ্বন্দ্বে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সাহেদ মিয়া সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার মঙ্গলপুর গ্রামের মোশাহিদ মিয়ার ছেলে।
বিজিবি ৪৮ এর সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল নাজমুল হক গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দৈনিক সংগ্রামকে জানান, বিএসএফ কোনো বাংলাদেশীকে আমাদের সীমান্ত এলাকায় হত্যা করেনি। মূলত হত্যাকা-ের শিকার হন ভারতীয় খাসিয়া কর্তৃক। সীমান্ত এলাকার মানুষ গরু-ছাগল আনতে বা ভুলক্রমে জিরো পয়েন্টের ওপারে চলে গেলে বা অন্য কোনো কাজে সীমান্ত অতিক্রম করলে খাসিয়ারা গুলী করে হত্যা করে। এসব ঘটনার পরপরই বিজিবির পক্ষ থেকে জোরালো প্রতিবাদ জানানো হয়। বিশেষ করে সীমান্ত অতিক্রম না করার জন্য সীমান্তবাসীকে আমরা বিভিন্নভাবে অবহিত করে থাকি। বিশেষ করে ওসমান হাদী হত্যাকা-ের পর বিজিবি সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত টহলের পাশাপাশি অতিরিক্ত টহল বাড়িয়েছে এবং সীমান্ত এলাকায় যাতে আইনশৃঙ্খলার কোনো অবনতি না ঘটে এজন্য বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
এমসি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক অহিদুর রব এ প্রতিবেদককে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের ভারতবিরোধী হওয়ার প্রধান কারণ সীমান্ত হত্যা। সিলেট সীমান্তের আরেকটি উপসর্গ ভারতীয় সশস্ত্র খাসিয়াদের দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিক হত্যা। গরু চোরাচালান ও বাংলাদেশের মানুষের সীমান্ত অতিক্রমের অজুহাতে গড়ে বছরে ১০০ বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়। লাশ ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া পতাকা বৈঠকের কোন সুফল আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়না। অপরাধ যদি কেউ করেও তবে, তাকে ধরে শাস্তি দেয়া যেতে পারে,কিন্তু তা না করে হত্যা করা কি বন্ধুত্ব বা সৎ প্রতিবেশীর পরিচয় ? বিষয়টি নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। ভারতের কাছে প্রশ্ন রাখতে হবে, হরিয়ানা থেকে শতশত মাইল অতিক্রম করে বাংলাদেশ সীমান্তে গরু আনার সময় তারা কোথায় থাকে? গরু চোরাচালান বন্ধ হলে বাংলাদেশের গবাদিপশু শিল্প ও আমাদের খামারীরা লাভবান হবে। সীমান্তে ভারত কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে, বাংলাদেশকেও নিজ সীমান্তে কাঁটাতারের না হোক, সাধারণ বেড়া দিতে হবে যাতে আমাদের গবাদিপশু ও মানুষ সীমানা অতিক্রম না করে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন মেনে শূণ্য রেখার ১৫০ মিটারের মধ্যে কোন বেড়া বা স্থাপনা নির্মাণ থেকে ভারতকে বিরত থাকার জন্য বলতে হবে, যেটা প্রায়ই ভারত করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশের সাথে কথা না বলে তালিকা না দিয়ে ঢালাওভাবে পুশইন বন্ধ করতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তুমপুর এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানান, বিএসএফ ও খাসিয়ার অত্যাচারে আমরা খুবই অতিষ্ঠ। দিনদুপুরে রাতবেরাতে আমাদের বাড়িঘরে বিএসএফ ঢুকে গরু ছাগল হাস মুরগি নিয়ে যায়। কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই সটকে পড়ে। এ ব্যাপারে আমরা বিজিবিকে জানালে কাজের কাজ কিছুই হয় না। ডিবি হাওর এলাকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন বলেন, আগেত ডিবির হাওর থেকে জোরপূর্বক মাছ ধরে নিয়ে যেত বিএসএফ। ৫ আগস্টের পর এখন এসব হয়রানি থেকে আমরা রক্ষা পেয়েছি। তবে তিনি এ ব্যাপারে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি বিজিবি ও বিএসএফ পর্যায়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।
ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) সংবাদদাতা : দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় সীমান্ত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে টহল তৎপরতা বৃদ্ধি এবং চেকপোস্ট স্থাপনের জন্য সদর দপ্তর বিজিবি হতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সেই নির্দেশ মেতাবেক ফুলবাড়ী ব্যাটালিয়ন (২৯ বিজিবি) এর দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত টহল তৎপরতা বৃদ্ধি এবং চেকপোষ্ট স্থাপন।
গত ২২ ডিসেম্বর খুলনা মহানগর এর এনসিপি নেতা মোতালেব সিকদার নামক ব্যক্তিকে দুর্বৃত্তরা মাথায় গুলী করলে সে গুলীবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়। পরবর্তীতে তাকে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। বর্তমানে সে চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং বর্তমানে তার অবস্থা আশঙ্খামুক্ত। উল্লেখ্য, গুলীবিদ্ধ ব্যক্তি মোতালেব সিকদার এনসিপি’র খুলনা বিভাগের বিভাগীয় শ্রমিক সংগঠনের সংগঠক।
উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে ফুলবাড়ী ব্যাটালিয়ন (২৯ বিজিবি) এর দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত টহলের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০টি বিশেষ টহলের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ স্থান সমূহে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ও সীমান্তে কড়া নজরদারী করা হয়েছে। এছাড়াও ফুলবাড়ী উপজেলার ঢাকা মোড় ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এবং বিরামপুর শহর ও মোহনপুর ব্রীজ এলাকায় ০৩টি অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে যানবাহন এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদেরকে তল্লাশী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
ফুলবাড়ী ব্যাটালিয়ন (২৯ বিজিবি) অধিনায়ক লে: কর্ণেল এএম জাবের বিন জব্বার বলেন, ফুলবাড়ী ব্যাটালিয়ন (২৯ বিজিবি) এর দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০টি বিশেষ টহলের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ স্থান সমূহে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।