শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : এক সময় এই গ্রামের সকাল শুরু হতো পাতকুয়া ঘিরে। টুপটাপ পানির শব্দ, কলসির ঠকঠক আওয়াজ, আর নারীদের হাসি-আড্ডা মিলে যেন এক অনবদ্য সুরে বেজে উঠত গ্রামীণ জীবনের সকালটা। শিশুরা তখন পাটকুয়ার পাশে ছুটে বেড়াত, কেউ পানিতে পা ডুবিয়ে খেলত, কেউ মাটিতে লাট্টু ঘোরাত। পাটকুয়া শুধু পানির উৎস ছিল না, ছিল গ্রামের প্রাণের স্পন্দন।

সেই পাতকুয়া এখন যেন নির্বাক এক স্মৃতিস্তম্ভ। পাশে আর কোনো নারী আসে না, শিশুর কোলাহলও নেই। আধুনিকতার দৌড়ে টিউবওয়েল, ডিপটিউবওয়েল, মোটরচালিত পানির লাইন এসে যেন গ্রামীণ জীবনের সেই সজীব অধ্যায়টাকে নিঃশব্দে মুছে দিয়েছে।

পাটকুয়ার পাশের পুরনো গাছটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে—কিন্তু তার নিচে আর কেউ বসে গল্প করে না। এক সময় সেই গাছের ছায়াতেই রোজ বিকেলে হতো মেয়েদের হাসি-ঠাট্টা, শাড়ি ধোয়ার ফেনায় মিশে যেত এক অন্যরকম আনন্দ। এখন সেখানে নিঃস্তব্ধতা। কেবল বাতাসে উড়ে আসে শুকনো পাতার শব্দ।

গ্রামের প্রবীণদের মুখে এখনো শোনা যায় সেই দিনের গল্পÑ “সেই সময় পাটকুয়ার পানি ছিল সবার অভিন্ন অধিকার। কে আগে, কে পরে—এ নিয়ে হাসি-ঠাট্টা চলত সকাল থেকে দুপুর। কেউ কলসি ভরত, কেউ পাশে বসে সুর করে গান ধরত। আর শিশুরা? তারা ছিল পাটকুয়ার প্রাণ।”

এখন গ্রামের শিশুরা মোবাইল হাতে খেলে। পাতকুয়ার গল্প তারা জানেই না। জানে না, একসময় সেই কুয়া ঘিরেই গড়ে উঠেছিল ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, এমনকি ছোটখাটো উৎসবও।

পাতকুয়া এখন শুকিয়ে গেছে, কিন্তু তার সঙ্গে শুকিয়ে গেছে গ্রামীণ সম্পর্কের উষ্ণতাও। আধুনিকতা সুবিধা এনে দিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে সেই সরল আবেগ, সেই মিলনের মুহূর্তগুলো।

যে পাটকুয়া একসময় হাসির প্রতিধ্বনিতে মুখর ছিল, আজ সেখানে নীরবতার প্রতিধ্বনি বাজে।

আর গ্রামবাংলার সেই স্মৃতি—এখন শুধু ইতিহাসের পাতায়, বুড়ো কণ্ঠের গল্পে, আর কিছু হারানো চোখের জলে।