নির্বাচন নিয়ে ম্যানুপুলেশন হলে জনগণ রুখে দেবে - আজিজুল বারী হেলাল
‘খুলনায় জুলাই গণঅভ্যূত্থান : গণমাধ্যম ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যূত্থানে গণমাধ্যম কর্মীরা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইন্টারনেট বন্ধের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বিদ্যমান ভয়াবহ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় পৌঁছে দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন তরান্বিত করেছিলেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ ও সাংবাদিকদের অবদান মাথায় রেখে আগামীর বাংলাদেশ বির্নিমাণে ফ্যাসিস্ট বিরোধী সকল পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার ওপর গুরুত্বরোপ করেন তারা। জুলাই গণঅভ্যূত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে শনিবার (৩০ আগস্ট) সকালে খুলনা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে এ আলোচনা সভা ক্লাবের ব্যাংকুয়েট হলে অনুষ্ঠিত হয়।
প্রেসক্লাবের আহবায়ক এনামুল হকের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব রফিউল ইসলাম টুটুলের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের সাবেক সদস্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, মহানগর বিএনপির সভাপাতি এডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা, মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান, জেলা বিএনপির আহবায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন, মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি এডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল ও শহীদ সাকিব রায়হানের মাতা নুর নাহার বেগম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন খুলনা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আহবায়ক কমিটির নির্বাহী সদস্য শেখ দিদারুল আলম, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজের সহকারি মহাসচিব এহতেশামুল হক শাওন, মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসান হিমালয়, টিভি রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক রকিবুল ইসলাম মতি, নির্বাহী কমিটির সদস্য কৌশিক দে বাপী ও আশরাফুল ইসলাম নুর। স্বাগত বক্তব্য রাখেন উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিলটন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই আন্দোলনে হাজারো ছাত্র জনতা জীবন দিয়েছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের জন্য। রাষ্ট্র্রের সকল খাতকে পরিচ্ছন্ন করে এমন ব্যবস্থা কায়েম করা যাতে কেউ ক্ষমতায় গিয়ে আজীবন কর্তৃত্ববাদী হয়ে না উঠতে পারে। তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন হয়েছিল। কিন্তু সকল রাজনৈতিক দল সব ইস্যুতে একমত হতে পারেনি। এটা সম্ভবও হয়না। কিন্তু আমরা বলেছিলাম, যেসব ইস্যুতে মতৈক্য হয়েছে, সেগুলোতে স্বাক্ষর করে জুলাই সনদকে আইনী ভিত্তি দেওয়া।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমাদের অনেক বক্তব্য মিসকোট করা হয়। বলা হচ্ছে জামায়াতে ইসলাম নির্বাচন চায়না। কিন্তু আমার বলছি, ফেব্রুয়ারীতে না, দরকার হলে ডিসেম্বরেই নির্বাচন দেন। কিন্তু তার আগে কযেকটি বিষয় নিশ্চিত করেন। এক. আমাদের সন্তানদের যারা মানবতাবিরোধী ভাবে খুন করেছে তাদের বিচার নিশ্চিত দৃশ্যমান করেন। দুই. প্রতিটি সেক্টরে সংস্কার দৃশ্যমান করেন। তিন. জুলাই সনদকে আইনী ভিত্তি দেন। কিন্তু তা না করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হঠাৎ করেই নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করলেন, যা সন্ধেহজনক। এ জন্য তার ওপর কোন চাপ আছে কিনা জানতে চেয়ে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, ১৪, ১৮, ২৪ তিনটি নির্বাচনে দেশের জনগণ ভোট দিতে পারেনি। এবারও কোন ষড়যন্ত্র করা হলে তা জনগণ মেনে নেবে না। দেশের নানা ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরে তিনি বলেন, যে ফ্যাসিবাদকে বিদায় করা হয়েছে তারা আর কখনোই ফিরবে না। রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের নামে ফ্যাসিবাদকে আবারও প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল বলেন, দিল্লির সরকার বাংলাদেশে একটি পাপেট সরকার বসাতে চায়। তাদের সেই চক্রান্ত অব্যাহত আছে। তবে আমাদের আশার কথা হচ্ছে, জুলাই অভ্যূত্থানের সকল শক্তি ঐক্যবদ্ধ আছি। নির্বাচন যদি অনিশ্চিত হয়, তাহলে আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। এ জন্য নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন হওয়াটা দরকার। নির্বাচন নিয়ে কোন ধরনের ম্যানুপুলেশন করার চেস্টা করা হলে জনগণ তা রুখে দেবে। তিনি খুলনার পুলিশ প্রশাসনের সাম্প্রতিক সময়ের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, থানায় থানায় পুলিশ বাদী হয়ে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের পরীক্ষিত কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করছে। পুলিশ প্রশাসন ও সিভিল প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থাকার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা যথাযথ দায়িত্ব পালন না করলে জনগণ তা মেনে নেবে না।
অুনষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান আগামী প্রজন্মের কাছে আদর্শ অনুপ্রেরণা হিসেবে থাকবে। আমাদের সন্তানেরা দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়। আওয়ামী ফ্যাসিজমকে রুখতে কিশোর তরুনরা অদম্য সাহস নিয়ে মোকাবেলা করেছেন। এই আন্দোলনে ১৫০ জন চোখ হারিয়েছে, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, দেড় হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। এত ত্যাগ যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের জন্য আমাদের সন্তানেরা করেছেন তার কোনো অংশ এখনও পুরণ হয়নি। ১৫ বছর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা স্বৈরশাসন ও কালাকানুনের কবল থেকে দেশের সংষ্কার এখনও হয়নি। আমরা চাইনা আর কোন ফ্যাসিজম এই দেশে জন্ম নিক। এজন্য সকলকে সচেতন থাকার আহবান জানান নেতৃবৃন্দ।
জুলাই অভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের ভূমিকা তুলে ধরে নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকার যখনই জনগণের ওপর অস্ত্র তাক করেছে গনমাধ্যমের কলম তখন গর্জে উঠেছে। যখন আন্দোলন দমাতে সরকার দেশের ইন্টারনেট ও মোবইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়েছে তখনও সাংবাদিকরা বিকল্প ব্যবস্থায় কাজ করেছে। এমনকি বিদেশে অবস্থানরত সাংবাদিকরা দেশের অবস্থা বিশ^ গণমাধ্যমে তুলে ধরে। একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যম। যে কারণে দেশে রাজনৈতিক বয়ান তৈরিও করে সংবাদমাধ্যম। যার কারণে রাজনীতিবিদরা সংশোধন করে নেন নিজেদের। অন্যদিকে যারা সংশোধন করতে পারে না তারা আস্তকুড়ে নিক্ষেপিত হয়। যেমনটা হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষেত্রে।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আদর্শকে মনে ধারণ করতে হবে। এ আন্দোলনে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে। আন্দোলনকালে জনঅভিপ্রায় বিষয়ে নিরবচ্ছিন্ন প্রচারের কারণেই আন্দোলনটি গতি লাভ করে এবং সাধারণ মানুষের সমর্থন পায়। তারা বলেন, এটি কেবল ছাত্র আন্দোলন ছিলো না, বরং গণমাধ্যমের সহায়তায় এটি গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন ধরে রাখতে সাংবাদিকদের গুজব থেকে সাবধান থাকতে হবে। সংগ্রামের সময় যে সব সাংবাদিক ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থন করেছে, তাদের থেকে সজাগ থাকতে হবে।