রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাস যাত্রীসহ পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। দুর্ঘটনার বাসটির রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে গত বুধবার (২৫ মার্চ) দুপুর আড়াইটায় ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া রাজবাড়ী মালিক সমিতির 'সৌহার্দ্য পরিবহন' যাত্রীবাহী বাসটি বিকেল ৫টার দিকে দুর্ঘটনার শিকার হয়।

ফেরিতে উঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে' পদ্মা নদীতে পড়ে নিমজ্জিত হয়, এতে প্রাণ হারায় ২৬জন যাত্রী। এদের মধ্যে ৮জন পুরুষ, ১১ জন নারী এবং ৭জন শিশু। নিহতদের মধ্যে ১৮জন রাজবাড়ী জেলার বাসিন্দা। বাকিরা কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ এবং ঢাকার বাসিন্দা।

ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, বুধবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রায় ৬০ ফুট গভীরে ডুবে যায় বাসটি। দীর্ঘ সময় অভিযান চালিয়ে রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে বাসটি উদ্ধার করা হয়। বাসটিতে আনুমানিক ৪০ জন যাত্রী ছিলেন।

নিহতদের মধ্যে রাজবাড়ীর ১৮ জন হলেন পৌরসভার মৃত ইসমাইল খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১), সজ্জনকান্দার মৃত ডা. আবদুল আলিমের মেয়ে জহুরা অন্তি (২৭), কাজী মুকুলের মেয়ে কাজী সাইফ (৩০), কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭), দাদশী রামচন্দ্রপুরের সোবাহান মন্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার (২৬), আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮), বেনি নগরের মান্নান মন্ডলের স্ত্রী জোসনা (৩৫), চর বারকিপাড়ার রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২), মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), কালুখালী ভবানীপুরের বিল্লাল হোসেনের মেয়ে ফাইজ শাহানুর (১১), রতনদিয়া মহেন্দ্রপুর বেলগাছির আব্দুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা জেসমিন (৩০), ছেলে আব্দুর রহমান (৬) ঝাউগ্রামের মজুন শেখের ছেলে উজ্জল শেখ (৪০), চরমদাপুরের আফসার মন্ডলের ছেলে আশরাফুল, ছানাউল্লার ছেলে জাহাঙ্গীর এবং বালিয়াকান্দির আরব খানের ছেলে (গাড়িচালক) আরমান খান (৩১)।

অন্য ৮জন হচ্ছে কুষ্টিয়া মজমপুরের আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), খাগড়বাড়িয়ার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), খোকসার ধুশুন্দুর এলাকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইসরাফিল (৩), সমসপুরের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), ঝিনাইদহ শৈলকুপা থানার কাচেরকোল খন্দকবাড়িয়ার নুরুজ্জামানের মেয়ে আরমান (৭ মাস), গোপালগঞ্জের আমতলী এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুক্তা খানম (৩৮), দিনাজপুরের পলাশবাড়ী মথুয়ারার মৃত নুর ইসলামের স্ত্রী নাছিমা (৪০) এবং ঢাকার আশুলিয়া থানার বাগধুনিয়া পালপাড়ার মো. নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০)।

নিহতদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয়দের সহায়তায় ৮জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

তাদের মধ্যে ৩জন পুরুষ ও ৫জন নারী। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক ২নারীকে মৃত ঘোষণা করেন। সবমিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬ জনে। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার করেছে ২৩ জন, স্থানীয়দের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া ২জনকে হাসপাতালে মৃত ঘোষণা করা হয় এবং নৌবাহিনীর ডুবুরিরা উদ্ধার করেন ১জন। উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ও ১০ জন ডুবুরি অংশ নেন।

পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের সদস্যরাও যৌথভাবে উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ করেন।

এই ঘটনায় ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের একজন প্রতিনিধি, নৌ পুলিশের একজন প্রতিনিধি, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের একজন করে প্রতিনিধি রাখার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়াও ঘটনার দিন ২৫ মার্চ রাতে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সদস্যসচিব করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট অপর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে, যা আজ শেষ হচ্ছে।

এ কমিটির সদস্যরা হলেন, রাজবাড়ী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস), বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক এবং রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক।

এদিকে নিহত পরিবারের কাছে সরকারি সহায়তার ২৫ হাজার টাকা এবং দুজন আহতকে ১৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে বলে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার নিশ্চিত করেন। সেই সঙ্গে এ ঘটনায় নিহত কুষ্টিয়া জেলার চারজনসহ গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর, ঢাকা ও ঝিনাইদহ জেলার একজন করে নিহত ৮ জনের টাকা ওইসব জেলার জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে।

কুষ্টিয়া সদরের জুগিয়ায় মর্জিনা খাতুনের নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় পরদিন দুপুরে। একই সময়ে সমসপুর গ্রামে আয়েশা বিনতে গিয়াসের জানাজা ও দাফন হয়। পরে ধুশুন্ডি গ্রামে শিশু ইসরাফিলের জানাজা-দাফন অনুষ্ঠিত হয় স্থানীয় কবরস্থানে। খাগড়বাড়িয়ার শৈলডাঙা মহাশ্মশানে রাজীব বিশ্বাসের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। শোকাবহ এই ঘটনায় নিহতদের পরিবার ও এলাকায় নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।

কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শোমসপুর ইউনিয়নের সন্তোষপুর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন, তার স্ত্রী নূর নাহার এবং তাদের একমাত্র সন্তান ইসরাফিল। আদরের শিশুপুত্রকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে স্ত্রীকে পাশে নিয়ে বাসে বসে ছিলেন তিনি। এ সময় ফেরিতে ওঠার মুহূর্তে বাসটি পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রী অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও নিখোঁজ হয়ে যায় তাদের একমাত্র সন্তান ইসরাফিল। গভীর রাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নদী থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন। সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে সর্বস্ব হারানো মানুষের মতো গ্রামে ফেরেন দম্পতি।

মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছে কুষ্টিয়ার খোকসার যুবক খাইরুল ইসলাম (২৬)। তবে নদী সাঁতরে তীরে ওঠার পর এক তথাকথিত উদ্ধারকারীর হাতে নিজের মুঠোফোনটি খুইয়েছেন তিনি। মোবাইল ফোন হারালেও ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরতে পেরে আল্লাহ্ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করছেন খাইরুল। ঈদের ছুটি শেষে ওই বাসে কর্মস্থল ঢাকায় ফিরছিলেন তিনি।

কুমারখালী পৌর টার্মিনালের অত্র পরিবহনের কাউন্টার মাষ্টার গতকাল শনিবার জানান, রাজবাড়ী মালিক সমিতির যাত্রীবাহী ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। চালক নিজে এবং বাসের যাত্রীদের বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। দৈনিক সংগ্রামকে তিনি আরো জানান, মারা যাওয়া চালকের বাড়ী রাজবাড়ীর পাংশায়। যানবাহন চলাচলের সময় দূর্ঘটনা ইচ্ছে করে হয় না, কেউ রাস্তায় একটি কুকুরও মারতে চায় না বলে তিনি মন্তব্য করেন। যাত্রীদের মাঝে এতে কোন প্রভাব পড়েছে কীনা? জানতে চাইলে তিনি জানান, ঈদের পরের সময় হওয়ায় যাত্রীদের অনেক চাপ আছে। কুমারখালী থেকে দুটি বাস নিয়মিত ঢাকার উদ্যেশ্যে চলে। তবে দূর্ঘটনার পওে যাত্রীরা এসে বাসের চালকের কঠোর সতর্কতার জন্য বার বার তাগাদা দিচ্ছে, আমরাও যাত্রীদের আসস্থ করছি। এই কাউন্টার মাষ্টার বলেন, আসলে চলার পথে যাত্রীদেরও সতর্ক থাকা দরকার। বিশেষ করে ফেরিতে বাস উঠা-নামার সময় সজাগ থাকা জরুরী। বাস থেকে নেমে হেঁটে ফেরিতে উঠা উচিত।