মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস : চলতি মওসুমে রংপুর অঞ্চলের চাষিরা আমের মুকুলের ভাঁজে ভাঁজে দেখছে সোনালি স্বপ্নের হাতছানি। অনুকুল আবহাওয়ার সুবাদে আশা করছে বাম্পার ফলনের।
আমের মুকুলে স্বপ্ন বুনছেন রংপুর অঞ্চলের চাষিরা। উল্লেখ্য, চলতি মওসুমে রংপুর অঞ্চলের রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা এই ৫ জেলায় প্রায় ৬ হাজার ৩শ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের সুমিষ্টি আম চাষ হয়েছে। এবারে আম উৎপন্নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৯৩ হাজার মেট্রিক টন। আমের চলতি মওসুমে গাছে গাছে ফুটেছে ব্যপক আমের মুকুল। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সেই মুকুলের মৌ মৌ মিষ্টি ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণে চাষিদের মনও আনন্দে অপ্লুত হয়ে উঠছে। মৌসুমের শুরুতেই কুয়াশা থাকলেও এখন প্রকৃতির পরিবেশ অনেকটাই অনুকূলে। ডালে ডালে ভরা আমের মুকুলে স্বপ্ন বুনছেন রংপুর অঞ্চলের চাষিরা। গত কয়েক বছরে সুমিষ্ট হাঁড়ি ভাঙ্গা সহ বিভিন্ন জাতের আম চাষে বদলে গেছে এই অঞ্চলের চাষিদের জীবনমান।
মুকুলের মৌ মৌ গন্ধ আর মৌমাছির গুনগুন শব্দে শুভাসিত ও মুখরিত গোটা অঞ্চল। মুকুলের ভাঁজে ভাঁজে প্রোথিত রয়েছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। কয়েক দিনের মধ্যে মুকুলের পেট চিড়ে বের হবে আমের নানা আকারের সোণালী আর সবুজ আবরনের দানা। আগামির সোনালি স্বপ্নে আম চাষিরা বিভোর।
সরেজমিনে আম বিভিন্ন বাগানে গিয়ে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকার বাগান জুড়ে চোখ ধাঁধানো মুকুলের সমারোহ, নয়নাভিরাম চিরচেনা সেই অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য যে কারোরই মনকে দোলা দিবে। আম চাষিরা তাদের সোনালি স্বপ্নের কথা ভেবে এখন আম বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
চাষিরা জানান, আমের প্রাকৃতিক ক্ষতির মোকাবেলায় আগাম সর্তকতা হিসেবে প্রয়োজনীয় যত্ন শুরু করেছেন তারা। স্প্রে, গাছের গোড়ায় পানি দেয়া, পানি ছিটানোসহ মুকুলের স্থায়িত্বসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের যত্ন নিচ্ছেন তারা। শীত বেশি থাকলে আমের মুকুল আসা ও গুটি আমের ক্ষতি হতে পারে। এই মুকুল টিকে থাকলে আমের ফলন ভালো হবে। আবার আগাম আমের দাম ও পাওয়া যাবে। গতবছর রংপুর মহানগরীসহ জেলায় আমের ফলন কম হওয়ায় এবার আশানুরূপ ফলনের আশায় বুক বেঁধেছেন আম চাষীরা।
রংপুর সদর উপজেলার পালিচড়া, শ্যামপুর, লাহেড়ীরহাট, মিঠাপুকুর উপজেলার গোপালপুর, পদাগঞ্জ, পাইকারেরহাট, রূপসী, রানীপুকুর, মৌলভীবাজার, সর্দারপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, গাছে গাছে ফুটেছে মুকুল, যা ছড়াচ্ছে মুগ্ধতা। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। মৌসুমের শুরুতেই কুয়াশা থাকলেও এখন প্রকৃতিও বেশ অনুকূলে। এবার ডালে ডালে ভরা আমের মুকুলে ভালো ফলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় চাষিরা আমের মুকুলের প্রয়োজনীয় যত্ন নিচ্ছেন। বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের কাঁচা বাড়ি নয়াপাড়া গ্রামের আম চাষি শাহাবুল ইসলাম জানান, হার আম বাগানে পর্যাপ্ত মুকুল এসেছে। কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে কয়েক লাখ টাকার আম বিক্রি করতে পারবেন।
বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ জানান, বদরগঞ্জ উপজেলায় এবারে ৫৫৮ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে। আমের বাম্পার ফলনের সম্ভবনা রয়েছে বলে তিনি আশা করছেন। সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সময়ের আগেই কিছু গাছে মুকুল আসছে। হাড়িভাঙ্গাসহ অন্যান্য আমের মুকুল এবার আগাম হয়েছে। তাতে তেমন কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় ৬ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছিল। উৎপন্ন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ৮৪ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন আম। তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এবার এই অঞ্চলে প্রায় ৬ হাজার ৩শ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯২ হাজার ৮৩৫ মেট্রিক টন আমের। তবে হাড়িভাঙ্গার উৎপত্তিস্থল রংপুরে গত বছর ১ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে হাড়ি ভাঙ্গার চাষ হয়েছিল। এ বছর তার চেয়ে বেশি হবে বলে আশা কৃষি বিভাগের। চাষিরা বলছেন, হাড়িভাঙ্গা আমের বৈশিষ্ট হচ্ছে এক বছর বেশি ফলন হয়, আবার পরের বছর কম হয় এটাই স্বাভাবিক। দাম কম পাওয়ায় প্রতি বছরই ব্যবসায়ীদের কাছে আমের বাগান আগাম বিক্রি করতে হয় বলে জানান তারা। তবে সরকারি সুযোগ সুবিধা ও হিমাগারের ব্যবস্থা হলে তারা আম বিক্রি করে লাভবান হবেন।
মিঠাপুকুরের পদাগঞ্জ এলাকার চাষি নুর হোসেন বলেন, আমের মুকুল এবার ভালোই আছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলন পাওয়া যাবে। একই উপজেলার এলাহি মোড় চকবাজার এলাকার হামিদুর রহমান বলেন, পদাগঞ্জ অঞ্চল হাঁড়িভাঙ্গাসহ আমের জন্য বিখ্যাত। সঠিক দাম পেলে চাষিরা আরও লাভবান হবেন। তবে লোকসান নেই। রাণীপুকুর এলাকার মিনজারুল ইসলাম বলেন, এবার আমের ভালো মুকুল এসেছে। গত বছরের চেয়ে বেশি। সঠিক পরিচর্যা করলে ভালো ফলন হবে। আশা করছি আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে লাভবান হবেন। সদর উপজেলার আম ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান বলেন, আগাম বাগান নিয়ে রেখেছি ভালো লাভের আশায়। লাভের আশা থাকলেও ফলন নিয়ে সন্দিহান।
রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ পরিচালক মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন জানান, রংপুর জেলার ৮ উপজেলায় আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩৪৫ হেক্টর জমি। এর মধ্যে হাড়িভাঙ্গা আম ১ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। আশা করছি পরিচর্যা ভাল হলে মুকুল পরবর্তী আশানুরুপ ফলন হবে। আম বাগান এলাকায় কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আফজাল হোসেন জানান, রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় এবারে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ করা হয়েছে । এ অঞ্চলে জনপ্রিয় হাঁড়িভাঙ্গা আমসহ অন্যান্য জাতের আমের মুকুলে ছেয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই হাঁড়িভাঙ্গা আম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এজন্য দেশে-বিদেশে এই আমের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলার মধ্যে রংপুর জেলাতেই আম চাষ বেশি হয়।