আলীকদম (বান্দরবান) সংবাদদাতা : পাহাড়ি জনপদ বান্দরবান-এর আলীকদম উপজেলায় অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্যে বন উজাড়, পাহাড় কাটা ও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের চোখের সামনেই এসব কার্যক্রম চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ফলে পাহাড়, বন ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী, উপজেলায় তিনটি ইটভাটা সক্রিয় রয়েছে—আলীবাজারের পূর্বে মেসার্স ফাতেমা ব্রিকস (মালিক: শওকত আলী তালুকদার) এবং চারাবটতলী তারাবুনিয়া এলাকায় আলামিন ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিং (মালিক: নাজমুল হক), আমতলীতে ইউনিক্স ব্রিকস ম্যানুফেকচারিং (মালিক: জামাল উদ্দিন)। তবে উপজেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, এ তিনটি ভাটার একটিরও বৈধ অনুমোদন নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই ভাটাগুলো গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ। ব্রিকস ফিল্ড মালিকরা নানানভাবে স্থানীয় প্রতিবাদকারীদের ম্যানেজ করেছে বলেও জানা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ইট পোড়াতে কয়লার বদলে বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা গাছপালা ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে আলীকদম-থানচি সড়কের আশপাশের বনভূমি থেকে বিপুল পরিমাণ লাকড়ি সংগ্রহের কারণে এলাকাজুড়ে বৃক্ষনিধন বেড়েছে। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভূমিধসসহ নানা বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ভাটা স্থাপনের বিধিমালা উপেক্ষা করে বসতিপূর্ণ এলাকাতেই এসব ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। ইটভাটাগুলোতে পাহাড় কেটে মাটি উত্তোলন, বন উজাড় এবং কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে দেওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যেই ঘটছে। তবু প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেই এটিকে দায়িত্বহীনতা, এমনকি নীরব সমর্থন হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাতের আঁধারে ট্রাকভর্তি মাটি সরিয়ে নেওয়া এবং দিনের বেলায় বিষাক্ত ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যাওয়ার দৃশ্য নিয়মিত হলেও কার্যকর অভিযান নেই। ভাটাগুলোর আশপাশে কয়েক লাখ ঘনফুট বনজ কাঠ মজুত করে রাখা হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা। বর্তমানে এসব ভাটা থেকে প্রায় পাঁচ লাখ পোড়া ইট উৎপাদন হয়েছে এবং আরও ইট পোড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। তিনটি ইট ভাটার ১ কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় ও মাদরাসা। রয়েছে জনবসতিও।
এছাড়া ১৪ বছরের নিচে শিশুদের দিয়ে ইট তৈরির কাজ করানোর অভিযোগও উঠেছে। অথচ ২০০৬ সালের শিশুশ্রম (নিষিদ্ধ) আইন, সংশোধিত ২০১৩ ও ২০১৮ অনুযায়ী এ ধরনের শ্রম সম্পূর্ণ দ-নীয় অপরাধ। তবুও আইনের তোয়াক্কা না করেই শিশুদের কাজে লাগানো হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান।
আলীবাজার এলাকার বাসিন্দা রফিক বলেন, “ইটভাটার কারণে সড়ক নষ্ট হয়ে গেছে। টমটম চালানো যাচ্ছে না, ধুলাবালিতে মানুষ অতিষ্ঠ। লোক দেখানো অভিযান না চালিয়ে স্থায়ীভাবে এসব ভাটা বন্ধ করা দরকার।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শামিম আরা রিনি সাংবাদিকদের বলেন, “জেলায় কোনো ইটভাটার অনুমতি নেই। অবৈধভাবে কেউ ইটভাটা পরিচালনা করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ ইটভাটা কেবল বনভূমি নয়, দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। দ্রুত আইনি ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।