গফরগাঁও থেকে শরীফুল ইসলাম : উপজেলা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপত্তি হয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের ভেতর দিয়ে ৯৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বয়ে গেছে নরসুন্দা নদী। কিশোরগঞ্জ জেলার প্রাণ নরসুন্দা নদী অবৈধ দখল- দূষণে এবং ভরাটের মহা উৎসবে আজ প্রায় বিপন্ন। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। এঁকেবেঁকে বয়ে চলা নদীর মাঝে পাওয়া যায় হৃদয়ের স্পন্দন। পৃথিবীর সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী থাকার পরেও এদেশের নদ-নদীগুলো প্রায় বিলুপ্ত। কবির ভাষায়, ধানের দেশ, গানের দেশ তেরো শত নদীর দেশ , আমাদের এই বাংলাদেশ। ছবির মতো এ দেশটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং মানবসৃষ্ট নানা কর্মকাণ্ড এর জন্য বেশীরভাগ দায়ী। কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা নদী এর নীরব সাক্ষী। এক সময় দেখা মিলতো নরসুন্দা নদীতে স্রোতের প্রবাহ, পাল তোলা নৌকা, নদীতে সাঁতার কাটতে, মৎস্য আহরণ, নদী কেন্দ্রিক জীবন যাপনের প্রবাহমান ধারা ছিল। কিন্তু কালের প্রবাহে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। হোসেন পুরের কাওনা এলাকায় বাঁধ দেওয়ার ফলে নরসুন্দা নদীটি তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে গেছে। নরসুন্দা নদীতে বিভিন্ন ভাবে দখল করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নরসুন্দা নদীতে দখল দারিত্বের মহা উৎসবে প্রতিদিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। নরসুন্দা নদীটি প্রভাব শালীদের দখল ও ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এক সময়ের খরস্রোতা নরসুন্দা এই নদী আজ মৃত প্রায়। প্রকৃতিতে ভেসে বেড়ায় প্রতিনিয়ত নদীর নীরব আর্তনাদ। নদী রক্ষায় ২০১২ সালে আওয়ামীলীগ সরকারের শাসনামলে ১১০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল মাত্র ৩৩ কিলোমিটার নদী খনন করা হয়েছিল কিন্তু সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে নদীর নাব্যতা রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে নরসুন্দা নদীতে দখল করে একটি স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। নরসুন্দা নদীর অস্তিত্ব এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। এখন জনমনে প্রশ্ন জাগে এ দৃশ্য কি কারো চোখে পড়ে না? না কি প্রভাবশালীদের রক্ত চক্ষুর ভয়ে সাক্ষী গোপাল কিশোরগঞ্জের সাধারণ মানুষ? একটি নদী শুধু পানি প্রবাহ নয়, এটি একটি শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যতের ধারক। নরসুন্দা ভরাট হওয়ার কারণে আমাদের বাণিজ্যিক অর্থনীতি বিরাট স্থবিরতা বিরাজমান। নরসুন্দা হারিয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো শহরের পরিবেশগত ভারসাম্য। ফলে নদীর তলদেশে পলি মাটির জমাট বাঁধায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়াও দেশের বেশিরভাগ নদী দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে প্রতিনিয়ত সংকুচিত হয়ে পড়ছে নদীগুলো। প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, আর শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি, মৎস্য জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। শিল্প কারখানার বর্জ্য ও পৌরসভার বর্জ্যের কারণে নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে উঠছে, যা মানুষের জীবন ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। একটি দেশের পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ ও জীববৈচিত্র্যের মূল ভিত্তি। জলবায়ু পরিবর্তন, দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত বাঁধ, শিল্প-কারখানার বর্জ্য ও নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ পরিবর্তনের কারণে দেশের প্রায় সব নদী এখন বিলুপ্তির পথে।

এ সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে নরসুন্দা নদী খনন, দখলমুক্তকরণ, নদীর দুই তীর সুরক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, দ্রুত নরসুন্দা নদী খনন ও দখল বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।