মাদকের বিস্তার অব্যাহত থাকলে দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং যানজটের কারণে জাতীয় অর্থনীতিও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ মোঃ আলী হোসেন ফকির।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র যানজটের কারণে ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে, যা বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উদ্যোগে গাজীপুর জেলা পুলিশ লাইন্স মাঠে আয়োজিত সুধী সমাবেশ ও ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইজিপি এসব কথা বলেন। পরে সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি আসন্ন ঈদযাত্রা উপলক্ষে নেওয়া বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে বিকেল ৪টায় সুধী সমাবেশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পুলিশ কমিশনার মোঃ ইসরাইল হাওলাদার। অনুষ্ঠানে গাজীপুর মহানগরীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং জনসেবামূলক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকির বলেন, মাদক আমাদের তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং এতে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সংকটে পড়তে পারে। তিনি বলেন, তরুণদের একটি অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ায় তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কিছু উসকানিদাতা শ্রমিকদের আন্দোলনের নামে রাস্তা অবরোধ করে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করছে, যার ফলে যানজট ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ছে। তিনি বলেন, দেশের ৯৯ শতাংশ শ্রমিক শান্তিপ্রিয় হলেও একটি ছোট গোষ্ঠী দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, গাজীপুর ও চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ দুই শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা না গেলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মান, ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইজিপি জানান, আসন্ন ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে। গাজীপুরের মহাসড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এবং যানজটমুক্ত রাখতে অতিরিক্ত চার শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি বলেন, মহাসড়কে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করতে চন্দ্রা এলাকায় শ্রমিকদের জন্য আলাদা মাঠ নির্ধারণ করে বাস থামানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি। তিনি বলেন, দেশে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও যানজটসহ নানা সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, গাজীপুরেও মাদক, ছিনতাই, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এমনকি কোনো রাজনৈতিক নেতাকর্মী এসব অপরাধে জড়িত থাকলেও তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোঃ হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে অপরাধ দমন সহজ হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম, ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক, জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আহম্মেদ হোসেন ভূঁইয়া, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন, গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোঃ শরিফ উদ্দীন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ডা. মাজহারুল আলম, শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরি সভাপতি সালাহ উদ্দিন সরকার, গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমীর অধ্যাপক জামাল উদ্দিন, গাজীপুর মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর মোঃ হোসেন আলী, গাজীপুর সদর মেট্রো থানা আমীর এডভোকেট সাদেকুজ্জামান খান, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ব্যারিস্টার ইসরাক আহমেদ সিদ্দিকী, গাজীপুর আইনজীবী সমিতির সভাপতি শামসুল হক ভূঁইয়া, বিএনপি নেতা আফজাল হোসেন কায়সার, আহাম্মদ আলী রুশদী, অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান এলিস, ভিপি জয়নাল আবেদীন তালুকদার, সাংবাদিক দেলোয়ার হোসেন, টঙ্গী পশ্চিম থানা বিএনপির আহ্বায়ক প্রভাষক বসির উদ্দিন, সদস্য সচিব ভিপি আসাদুজ্জামান নূর, মহানগর হেফাজতে ইসলামী নেতা মাওলানা মুফতি নাসিরুদ্দিন, টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গাজী সালাহউদ্দিন, ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন সিরাজী, স্পারো অ্যাপারেলসের মালিক শোভন ইসলাম, সালাহউদ্দিন আহমেদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
সমাবেশে নগরীর যানজট নিরসন, টঙ্গী এলাকায় ছিনতাই দমন, মাদক নির্মূল, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সমাবেশ শেষে পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে অতিথিরা অংশ নেন এবং দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও গাজীপুর মহানগরীর নিরাপত্তা কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।