নির্বাচন ডেস্ক
বাংলাদেশের ভঙ্গুর পুঁজিবাজারকে একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী ভিত্তি প্রদানের লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বড় ধরনের সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের যে দাবি উঠেছে, তার প্রতিফলন হিসেবে দুই দলই পুঁজিবাজারকে ‘মাফিয়ামুক্ত’ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইনসাফভিত্তিক ও কারসাজিমুক্ত বাজার
জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে পুঁজিবাজারকে একটি ‘জুয়া ও কারসাজিমুক্ত’ ইনসাফভিত্তিক বাজার হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা: জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারে যারা কারসাজি করে সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মাঝে বিতরণ করা হবে।
ইসলামী শরীয়াহ ভিত্তিক ইনডেক্স: জামায়াতের বিশেষ পরিকল্পনা হলো পুঁজিবাজারে ‘শরীয়াহ কমপ্লায়েন্ট’ কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং একটি শক্তিশালী ইসলামি ইনডেক্স তৈরি করা, যাতে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ নিশ্চিতভাবে বিনিয়োগ করতে পারে।
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: বিএসইসি, ডিএসই এবং সিএসই-তে স্বচ্ছতা আনতে পেশাদার ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে। কোম্পানিগুলোর অডিট রিপোর্টে কোনো জালিয়াতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট অডিট ফার্মের লাইসেন্স আজীবনের জন্য বাতিল করা হবে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি): স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ‘৩১ দফা’ ও ২০২৬-এর নির্বাচনী ইশতেহারে শেয়ার বাজারকে জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে।
মার্কেট অলিগার্কি নির্মূল: বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা পুঁজিবাজারে বিশেষ সিন্ডিকেট বা অলিগার্কদের প্রভাব চিরতরে বন্ধ করবে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো-কমানোর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হবে।
বিএসইসি’র স্বায়ত্তশাসন: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি শক্তিশালী ও পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের সুযোগ: ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমাতে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ার বাজারের মাধ্যমে অর্থায়নে উৎসাহিত করা হবে।
আইপিও-তে স্বচ্ছতা: আইপিও (ওচঙ) অনুমোদনের ক্ষেত্রে জালিয়াতি বন্ধে কঠোর স্ক্রিনিং পদ্ধতি চালু করা হবে যাতে দুর্বল কোম্পানি বাজারে ঢুকে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করতে না পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার ও
আগামীর চ্যালেঞ্জ
৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত ‘রিফর্ম বুক’ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার পুঁজিবাজারে সুশাসন ফেরাতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑবিগত আমলের বাজার কারসাজিকারীদের চিহ্নিত করতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন এবং ব্যাংক খাতের মতোই পুঁজিবাজারে নজরদারি বৃদ্ধি। বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই জানিয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে অন্তর্বর্তী সরকারের এই সংস্কার কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ব্যালট যুদ্ধই সিদ্ধান্ত নিবে জনগন
পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা গত ১৬ বছরে বারবার নিঃস্ব হয়েছে। ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালের ধসের পর বাজার কখনোই স্থিতিশীল হতে পারেনি। এবারের নির্বাচনে জামায়াত ও বিএনপির ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা যদি সততার সাথে বাস্তবায়িত হয়, তবেই সাধারণ মানুষ আবার বাজারে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে। তবে ভোটারদের দাবিÑকেবল ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি নয়, যারা গত কয়েক বছরে বাজারের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে, তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হোক।
১২ই ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধই বলে দেবে, কার অর্থনৈতিক সংস্কার ও পুঁজিবাজার রক্ষার পরিকল্পনার ওপর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখছে।