নির্বাচন ডেস্ক

আজ অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসন, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ার পর এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই বাস্তবতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জেনারেশন জেড বা জেন–জি প্রজন্ম,যারা এবার প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে জাতীয় রাজনীতির নিয়ামক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। প্রায় ৫০ লাখ তরুণ প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল তরুণ ভোটব্যাংকই এবারের নির্বাচনের টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা রাখা তরুণদের বড় একটি অংশ এবারও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। তাদের প্রধান দাবি—রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন ও টেকসই কর্মসংস্থান।

একজন তরুণ ভোটার বলেন, “দেশের মানুষকে আর রাজনৈতিক পরিচয়ে ভাগ করা যাবে না। সবাইকে আগে নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে।”

আরেকজন বলেন, “প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করছে, কিন্তু চাকরি নেই। আমরা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব সমাধান চাই।”

তরুণদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের অভাব আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই তরুণ সমাজকে সংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বিশেষ করে ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে গড়ে ওঠা নেতৃত্ব এখন জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

গত ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচনে ২১টি পদের মধ্যে ১৬টিতে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের বিজয় তরুণ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এতে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৬ দশমিক ১৮ শতাংশ।

এর আগে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে শিবির সমর্থিত প্যানেলের ধারাবাহিক বিজয় তরুণদের আস্থার প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এই নির্বাচনে বিজয়ী ছাত্রনেতারা এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় জামায়াতের প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন, ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করছেন। এতে তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ছে।

বিএনপির অবস্থান ও তরুণ ভোটারদের দ্বিধা

বিএনপি তরুণদের আকৃষ্ট করতে অর্থনৈতিক সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তাভিত্তিক কর্মসূচির ওপর জোর দিয়েছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’সহ বিভিন্ন ভর্তুকিমূলক প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পাশে রাখার চেষ্টা করছে।

তবে অনেক তরুণ মনে করছেন, এসব কর্মসূচি তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় এক তরুণ ভোটার বলেন, “কিছু মানুষের জন্য সুবিধা হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।”

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির কর্মসূচিতে কাঠামোগত সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখার ঘাটতি থাকায় তরুণদের বড় অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি)-এর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট নিশ্চিতভাবে ১০৫টি আসনে জয় পেতে পারে। অন্যদিকে বিএনপি জোট পেতে পারে ১০১টি আসন। এছাড়া ৭৫টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এই জরিপে সহযোগিতা করেছে প্রজেকশন বিডি ও জাগরণ ফাউন্ডেশন। বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনেই জেন-জি ভোটারদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের লড়াই নয়, বরং একটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অভ্যুদয়ের প্রতিফলন।

কলেজে পড়ুয়া একজন নারী শিক্ষার্থী বলেন, “বাবা-মা যেখানে ভোট দেয়, জেন–জি সেই দলকেই ভোট দেবে এমন নয়। তারা তথ্য, বিশ্লেষণ ও বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে জেন–জি ভোটাররা প্রমাণ করতে চলেছে—তারা কেবল ভবিষ্যতের নাগরিক নয়, বর্তমানের সিদ্ধান্তদাতা।

রাষ্ট্র সংস্কার, কর্মসংস্থান ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের যে স্বপ্ন তারা লালন করছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব আগামী সরকারের ওপর বর্তাবে।আর সেই সরকার কে হবে, তা অনেকাংশেই নির্ধারণ করবে নতুন প্রজন্মের এই সচেতন ভোট।