গণহত্যার দায় নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে পালিয়ে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা হঠাৎ করে প্রকাশ্যে এসেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করার পর অনেকটা নমনীয়তার সুযোগ নিয়ে দেশে বিভিন্ন এলাকায় গর্ত থেকে বের হচ্ছে ফ্যাসিবাদি দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির পর দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় হঠাৎ করে দখলে নেয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তারা দলীয় কার্যলয়ে এসে জয় বাংলা শ্লোগান দেয় এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। এসব নেতাকমীদের বিরুদ্ধে জুলাই আগস্টের গণহত্যার সাথে জাড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি যারা প্রকাশ্যে এসেছে তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা ও নাশকতার একাধিক মামলা।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে আসায় শংকিত সাধারণ মানুষ। যার আ¯ফালনে তারা ফিরে আসছে তাদের নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে মানুষ।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গিয়ে স্লোগান দিয়েছেন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। এ সময় তাদের হাতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি দেখা যায়।
নগরের উপকণ্ঠ সিটিহাট এলাকায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জেলা আওয়ামী লীগের এই কার্যালয়টিতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। কার্যালয়টির দরজা-জানালা এবং ইটও খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর থেকে কার্যালয়টি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। হঠাৎ সেখানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কয়েকজনের স্লোগান দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
চট্টগ্রামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উত্তর জেলার কার্যালয়ে দলীয় পরিচিতি ফলক লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। এসংক্রান্ত দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত সোমবার বিকেলে ছড়িয়ে পড়ে। তবে রাত আটটায় নগরের নিউমার্কেটের দোস্ত বিল্ডিংয়ে অবস্থিত কার্যালয়টিতে গিয়ে ফলকটি আর দেখা যায়নি। কার্যালয়েও তালা দেওয়া ছিল। রাতে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেয়।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আফতাব উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা পুলিশের একটি দল পাঠিয়েছি। তবে সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। ব্যানারও ছিল না। কক্ষগুলোতে তালা দেওয়া ছিল।’
জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই দেশের কয়েকটি এলাকায় এতদিন ধরে বন্ধ থাকা আওয়ামী লীগ কার্যালয় খুলেছিলেন দলের নেতা-কর্মীরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে নানা স্থানে খোলা হচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা দল আওয়ামী লীগের কার্যালয়।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরের পর বরগুনার বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ঢুকে পড়েন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ওই কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেয়া হয়েছিলো। নেতা-কর্মীরা সেখানে ঢুকে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙিয়ে দেন। কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ডও লাগানো হয়। কিন্তু রাতে ওই কার্যালয় আবার ভাঙচুর করা হয়।
বেতাগী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিফাত সিকদার ওইদিন সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, ধানমন্ডি ৩২সহ আমাদের স্থানীয় দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত শুরু করতে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরদিনই পঞ্চগড় সদরে চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিসের তালা খুলে ঢুকে পড়েন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। তারা সেখানে স্লোগানও দেন। সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ খান। তবে পরে আবার ওই অফিসে তালা মারা হয়।
এনিয়ে আবু দাউদ খান সাংবাদিকদের বলেন, আসলে ৫ আগস্টের পর ওটা আওয়ামী লীগের অফিস ছিলো না। আগে আওয়ামী লীগ অফিস ছিলো। পরে ওটা স্থানীয় বণিক সমিতির অফিস করা হয়।
পটুয়াখালী দশমিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে। অফিস খোলার পর সেখানে ছাত্রলীগ- যুবলীগের নেতা-কর্মীরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নামে দোয়া ও মোনাজাত করেন। পরে অবশ্য ওই কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়।
একইদিন বিকালে খুলনা মহানগরীর শঙ্খ মার্কেটে আওয়ামী লীগ অফিস খুলে সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রবেশ করেন। সেখানে তারা কিছুক্ষণ অবস্থান করে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবিতে মালা দিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দেন। এরপর তারা তালা লাগিয়ে চলে যান। তারা ছবি তুলে ফেসবুকেও দিয়েছেন।
খুলনা জেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়ক মাহমুদুল হাসান ফয়জুল্লাহ অভিযোগ করে সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির ছত্রছায়ায় আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে চাইছে। তারা নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে কাজে লাগিয়েছে। এখন তারা তার প্রতিদান নিচ্ছে। তবে তারা সফল হবে না। তাদের প্রতিরোধ করা হবে।
১৮ ফেব্রুয়ারি বুধবার সকাল সাতটার দিকে ছাত্রলীগের ৩০ থেকে ৩৫ জন নেতা-কর্মী তালা ভেঙে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ঢোকেন। এরপর ‘জয় বাংলা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে কার্যালয়টিতে একটি ব্যানার টাঙিয়ে সটকে পড়েন তারা।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের অফিস খোলার জন্য সরাসরি বিএনপির সহযোগিতাকে দায়ী করেন। তিনি একটি গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপি আবার ফ্যাসিবাদী শক্তিকে ফিরিয়ে আনতে চায়। আমরা দেখেছি বিএনপি নেতারাও আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলতে সহায়তা করছেন।
তিনি বলেন,আমরা নির্বাচনের পর থেকেই আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলতে দেখছি। আর নির্বাচনের সময় দেখেছি আওয়ামী লীগের যারা হত্যা মামলার আসামী তারাও বিএনপির সঙ্গে কাজ করছে। তাদের পোলিং এজেন্ট হয়েছে। তারা ধানের শীষে ভোট চাইতে গিয়ে জয়বাংলা স্লোগান দিয়েছে। বিএনপি তার ক্ষমতার জন্য আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে, ফিরিয়ে আনছে। কিন্তু এটা করে বিএনপির শেষ পর্যন্ত লাভ হবে না। তারা এখন জুলাইয়ের সংস্কারকেও অস্বীকার করছে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার জন্য৷ কিন্তু আওয়ামী লীগ যদি ফিরে আসে তখন বিএনওি থাকবে না।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তুলে পার্টি অফিস খোলেন। সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং আওয়ামী লীগের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি টাঙিয়ে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে কার্যালয় খুলেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ।
গণ–অভ্যুত্থানের পর থেকে পরিত্যক্ত থাকা খুলনা মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে প্রথমবারের মতো দলের নেতা–কর্মীদের গত ১৫ ফেব্রুয়ারি উপস্থিতি দেখা গেছে। নগরের লোয়ার যশোর রোডের শঙ্খ মার্কেট এলাকায় অবস্থিত কার্যালয়ে প্রবেশ করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একদল নেতাকর্মী।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি নওগাঁয় পতাকা হাতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার একটি ঘটনা ঘটেছে। এসংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি জেলা অফিসের সামনে ধারণ করা বলে দাবি করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের নেতাকর্মীরা।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে এদিন সকাল ৭টার দিকে দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান, জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। শফিকুর রহমান মামুন নিজেই তার ফেসবুক পেজে ভিডিওটি আপলোড করে শেয়ার করেছেন।
দীর্ঘ ১৮ মাস পর পাবনায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। ২০ ফেব্রুয়ারি দুপুরে শহরের প্রাণকেন্দ্র আব্দুল হামিদ সড়কে অবস্থিত দলীয় কার্যালয়ের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর পর আওয়ামী লীগের দিনাজপুর জেলা কার্যালয়ে প্রবেশ করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছেন নেতাকর্মীরা। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে এর প্রতিবাদে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি কার্যালয়ে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন।