গাজীপুরের কালীগঞ্জে নির্বাচনী আচরণবিধির প্রকাশ্য লঙ্ঘনের অভিযোগে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে একটি ভাইরাল ভিডিও। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্র ব্যবহার করে বিএনপির নির্বাচনী জনসভা আয়োজন এবং সমাবেশ শেষে সেই আসবাবপত্র পিকআপে করে ফেরত নেওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ভোটকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে কালীগঞ্জের আর আর এন পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিএনপির নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল আড়াইটায় শুরু হওয়া ওই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান। প্রধান বক্তা ছিলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ড. আসাদুজ্জামান রিপন। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর-৫ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হক মিলনসহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

সমাবেশের মঞ্চ সাজানো ও অতিথিদের বসার ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত। স্থানীয় সূত্র জানায়, অতিথিদের বসার জন্য কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজের সোফা-চেয়ারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে আর আর এন পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র ব্যবহারের অভিযোগও উঠে আসে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

সমাবেশ শেষে সন্ধ্যার দিকে পিকআপ ভ্যানে করে কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজে সরকারি আসবাবপত্র ফেরত নেওয়ার একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, আসবাব নামানোর কাজে যুক্ত কয়েকজনের গায়ে বিএনপির লোগোযুক্ত টি-শার্ট। এসব দৃশ্য ঘটনার সত্যতা নিয়ে আর সন্দেহের সুযোগ রাখেনি বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই।

কলেজ ও স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই এসব আসবাবপত্র নেওয়া হয়েছিল। তবে আইনজ্ঞ ও সচেতন মহলের প্রশ্ন-সরকারি সম্পদ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার কি আদৌ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের আছে? নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী সরকারি সম্পদের রাজনৈতিক ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে এই বাস্তবতা যে, কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজ ও আর আর এন পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-দুটিই আসন্ন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র হিসেবে নির্ধারিত। এসব প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবেও দায়িত্বপ্রাপ্ত। ফলে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবহারের ঘটনায় ভোটকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি অনুযায়ী, সরকারি যানবাহন, ভবন, আসবাবপত্রসহ কোনো সরকারি সম্পদ রাজনৈতিক দলের কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ। জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ধারা ৯১ অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে পুরো ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

ঘটনার পর কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজের অধ্যক্ষ ও আর আর এন পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা তদন্তের দাবি উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযুক্ত শিক্ষকদের প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিরপেক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হক মিলনের ভূমিকা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখার দাবিও উঠেছে।

ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর এলাকাজুড়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন-যাঁরা ভোট পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে জড়ায়, তাহলে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে? স্থানীয় একাধিক সূত্র ও ভাইরাল ছবি-ভিডিও বিশ্লেষণে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।