নড়াইল সংবাদদাতা : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নড়াইল-২ আসনে জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, এনপিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় নেমে পড়েছেন।মাঠে-ঘাটে চা স্টলে নির্বাচনি আমেজ বিরাজ করছে। নির্বাচনি দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে নির্বাচনি উত্তাপ। ভোটারদের মাঝে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের নিয়ে চলছে নানা সমীকরণ। লোহাগড়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন, লোহাগড়া পৌরসভা, নড়াইল সদর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও নড়াইল পৌরসভা নিয়ে নড়াইল-২ সংসদীয় আসন গঠিত। দীর্ঘদিন আওয়ামীলীগের দখলে থাকা এ আসনটিতে এবারের নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনি এলাকায় নেতাদের নিয়মিত গণসংযোগ এবং সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে এক ধরনের নির্বাচনি আমেজ তৈরি হচ্ছে। নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি এলাকার সাধারণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন তারা। ব্যানার-পোস্টার সাঁটিয়ে চাইছেন দোয়া। আ’লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন মামলার চাপে বিপর্যস্ত থাকলেও এখন জামায়াত ও বিএনপি’র কার্যালয় নেতা-কর্মীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে।

এ আসনটি আওয়ামীলীগের সাবেক এমপি মাশরাফি বিন মর্তুজার একক নিয়ন্ত্রণে ছিল। ৫ আগস্টের পর মাশরাফিসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নামে মামলা হওয়ার পর তারা এখন অনেকটা আতœগোপনে রয়েছেন।আ’লীগের তৃণমূল পর্যায়ের লোকজন চুপচাপ রয়েছেন।

সাধারন ভোটাররা জানিয়েছেন, এ জেলায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ কিংবা স্বাস্থ্যসেবার চিকিৎসার জন্য কোন হাসপাতাল নেই। কোনো ভারী শিল্প কারখানা নেই।ফলে বেকারত্বের হার এখানে অন্য জায়গার তুলনায় বেশি। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য এলাকার মানুষ এখন অনেক আশাবাদি। তারা যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার উন্নতির দাবি তুলছেন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে এসব দাবি প্রধান্য পাবে। তাই যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, এই দাবিগুলোর প্রতি তাদের বেশি জোর দিতে হবে।

নড়াইল-২ আসনে জামায়াতের একক প্রার্থী হলেন জেলা আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান বা”চু।অপরদিকে ধানের শীষের প্রার্থী হওয়ার মনোবাসনা নিয়ে অন্তত পাঁচজন নেতা মাঠে রয়েছেন। এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীরা হলেন-জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয় (বুয়েট) শাখার সাবেক যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ও পেশাজীবি নেতা প্রকৌশলী মো: হিমায়েতুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শাহরিয়ার রিজভী জর্জ, মেজর (অব.) কাজী মঞ্জুরুল ইসলাম প্রিন্স। এছাড়া ২০১৮ সালে এ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রধান সমন্বয়ক ন্যাশনাল পিপলস (এনপিপি) পার্টির চেয়ারম্যান বিএনপির শরীক দলের অ্যাডভোকেট ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নির্বাচনের জোর প্র¯‘তি তথা গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

তৃণমূলের জামায়াত সমর্থিত ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতনের পরও জামায়াতের আদর্শগত কারণে জনপ্রিয়তা ব্যাপক বেড়েছে। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জেলা আমীর অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান বাচ্চু। জামায়াতের জন্য নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচার-প্রচারনা ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। উপজেলা সদর এলাকা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড এমনকি গ্রাম পর্যায়ে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা গণসংযোগ, উঠান বৈঠক শুরু করেছেন।জামায়াতের নারী কর্মীরা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইছেন। এমনকি প্রতিটি সেন্টারে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ও পোলিং এজেন্ট কারা হবে, তাও ঠিক করা হয়েছে দলের পক্ষ থেকে।

তবে বিএনপি চাইছে এ আসনটি তাদের দখলে নিতে। যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলেই ধানের শীষের বিজয় অর্জিত হবে এমনটা মনে করছেন দলীয় নেতা-কর্মীরা।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হামলা-মামলা, হয়রানি ও নানা ধরনের দমন-পীড়নের মুখেও রাজপথে ছিলাম। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আশা করছি বিজয়ী হব’। প্রকৌশলী হিমায়েতুল ইসলাম বলেন, দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমি রাজনীতিকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে নয়, সেবার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবো। আমি মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে তাদেও সেবা দিতে চাই’।

এলাকায় নিয়মিত কর্মসূচি নিয়ে মাঠের অবস্থান পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন অ্যাডভোকেট ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের (চরমোনাই পীর) প্রার্থী হলেন অধ্যক্ষ মাওলানা তাজুল ইসলাম। এ আসনটিতে এবার বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াত প্রার্থীর মূল প্রতিদন্দ্বিতা হবে বলে রাজনীতিবিদ ও ভোটাররা মনে করছেন।

জানা গেছে, নড়াইল-২ আসনে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ’লীগের প্রার্থী শরীফ খসরুজ্জামান ৫৯ হাজার ৫০৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট এম, মকবুল হোসেন ৩২হাজার ৫১৬ ভোট পান।জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা নুরুন্নবী জিহাদী পান ৩১ হাজার ১৭৪ ভোট। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ’লীগের প্রার্থী শরীফ খসরুজ্জামান ৬৩ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির প্রার্থী আব্দুল কাদের শিকদার ৪২ হাজার ৭১৮ ভোট পান। জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা নুরুন্নবী জিহাদী পান ২২ হাজার ৯৩ ভোট। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ’লীগের প্রার্থী শেখ হাসিনা ৯৭ হাজার ১৯৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি মাওলানা শহিদুল ইসলাম পান ৯৩হাজার ৮১ হাজার। পরবর্তীতে উপ-নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি মাওলানা শহিদুল ইসলাম জয়ী হন। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ’লীগের প্রার্থী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস,কে আবু বাকের ১লাখ ২৫ হাজার ৫৯৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী বিএনপির প্রার্থী হিসেবে শরীফ খসরুজ্জামান ৬৯ হাজার ৬৭৪ ভোট পান। ২০১৪ সালের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী শেখ হাফিজুর রহমান ৯৫ হাজার ১১৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন পান ২২হাজার ৩২০ ভোট। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ’লীগের প্রার্থী ক্রিকেট তারকাখ্যাত মাশরাফি বিন মর্তুজার ২ লাখ ৭১ হাজার ২১০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির শরীক দলের ধানের শীষ প্রতিকের প্রার্থী এনপিপি’র চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ড.ফরিদুজ্জামান ফরহাদ পান ৭ হাজার ৮৮৩ ভোট।

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নড়াইল-২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৫ হাজার জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৯০ হাজার জন এবং নারী ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৯৫ হাজার জন।