মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।

বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদান করে। এসময় বিউগলের করুণ সুর বাজানো হয়। প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যগণ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ, শহীদ পরিবারের সদস্যগণ, কূটনীতিক এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ এসময় উপস্থিত ছিলেন।

পরে, দলীয় প্রধান হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের সিনিয়র নেতাদের সাথে নিয়ে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় মন্ত্রিপরিষদের পক্ষেও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মার শান্তি এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।

এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্মৃতিসৌধে উপস্থিত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। পরে, প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো তার গাড়ির স্ট্যান্ডে জাতীয় পতাকা সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে যাওয়া-আসার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী গাড়িতে পতাকা উড়তে দেখা যায়। এছাড়া মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস প্যারেড-২০২৬ অনুষ্ঠানেও জাতীয় পতাকাবাহী গাড়িতে আসেন প্রধানমন্ত্রী।

প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী

এদিন সকাল ৯টায় রাজধানী ঢাকার তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দরের জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে কুচকাওয়াজ শুরু হয়। অভিবাদন মঞ্চ থেকে সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহ ১০টার দিকে প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তাকে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌ বাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী।

এর আগে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং তিন বাহিনীর প্রধানগণ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ দেশি-বিদেশি অতিথিবৃন্দ। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মো. সাহাবুদ্দিনকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। খোলা জিপে প্যারেড পরিদর্শন করেন তিনি।

পরে মার্চপাস্ট শুরু হয়। এতে প্রথমে থাকে বিভিন্ন পতাকাবাহী তিনটি দল বা কন্টিনজেন্ট। এরপর পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রপতিকে সালাম দিতে এগিয়ে যেতে থাকে সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিট প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট, সাঁজোয়া রেজিমেন্ট কন্টিনজেন্ট, ইস্ট বেঙ্গল কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ ইনফ্যান্টারি রেজিমেন্ট, আর্টিলারি কন্টিনজেন্ট, এয়ার ডিফেন্স কন্টিনজেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারস কন্টিনজেন্ট, সিগনালস কন্টিনজেন্ট, সার্ভিসেস কন্টিনজেন্ট।

এরপর জাতীয় পতাকাবাহী কন্টিজেন্টের সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানান। এরপর পর্যায়ক্রমে আসে প্যারাকমান্ডো কন্টিনজেন্ট, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি, ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর, কারা পুলিশ, সম্মিলিত নারী কন্টিনজেন্ট ও মডারনাইজড ইনফ্যান্টারি কন্টিনজেন্টগুলো সালাম প্রদর্শন করে মার্চপাস্ট করে বেরিয়ে যায়। সেনা ও বিজিবির ডগ স্কোয়াড ও অশ্বারোহী কন্টিনজেন্টের পর খোলা গাড়িতে বহনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের কন্টিনজেন্ট এগিয়ে যায়।

এরপরই ১০ হাজার ফুট উপর থেকে মূল মঞ্চের দুদিকে ২৬ জন প্যারাট্রুপার প্যারেড গ্রাউন্ডে নামেন, যারা জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন বাহিনীর পতাকা বহন করেন। এরপর প্যারাকমান্ডো টিমের প্যারাট্রুপার দল রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদর্শন করেন। এরমধ্যেই মাথার ওপরে উড়ে যায় আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান। পর্যায়ক্রমে আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার, বিজিবি এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার, র‌্যাব এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার, নেভাল অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার উড়ে যায়।

এরপর প্যারেড গ্রাউন্ডে একে একে এগিয়ে আসে বিভিন্ন বাহিনীর যান্ত্রিক বহরগুলো; যেখানে ট্যাংক, কামানের মতো ভারী যুদ্ধাস্ত্র ও প্রযুক্তিসহ নানা সরঞ্জাম প্রদর্শিত হয়। এরপর প্যারাকমান্ডো টিমের প্যারাট্রুপার দল রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদর্শন করে। এরমধ্যেই মাথার উপরে উড়ে যায় আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান। পর্যায়ক্রমে আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার, বিজিবি এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার, র‌্যাব এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার, নেভাল অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার উড়ে যায়। এরপর প্যারেড গ্রাউন্ডে একে একে এগিয়ে আসে বিভিন্ন বাহিনীর যান্ত্রিক বহরগুলো; যেখানে ট্যাংক, কামানের মতো ভারী যুদ্ধাস্ত্র ও প্রযুক্তিসহ নানা সরঞ্জাম প্রদর্শিত হয়।

এরপরে শুরু হয় কুচকাওয়াজের এবারের অন্যতম আকর্ষণ বিমান বাহিনীর ‘অ্যারোবেটিক শো’র মহড়া। ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’ এই প্রতিপাদ্যে বিমানবাহিনীর যুদ্ধ বিমানসহ প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টারগুলো বিভিন্ন ফরম্যাশনে উড্ডয়ন কৌশল প্রদর্শিত হয়। পাঁচটি এফ-সেভেন যুদ্ধবিমান বর্ণিল রং ছাড়তে ছাড়তে প্যারেড গ্রাউন্ড প্রদক্ষিণ করে। ‘লো লেভেল’ ফ্লাইং বিমান প্রদর্শনীর পর যোগ দেয় মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান।

এই আধুনিক যুদ্ধবিমানটি রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্লাইং স্যালুট’ প্রদর্শন করে। এরপর কয়েক দফা টার্ন পারফরম্যান্স, লো লেভেল ফ্লাইংও প্রদর্শিত হয়। শেষে মূল মঞ্চের পেছন দিক থেকে এসে ‘ভিক্টোরি রোল’ প্রদর্শন করে উপরের দিকে মেঘের আড়ালে চলে যায় মিগ-২৯, যেটিকে ‘চূড়ান্ত প্রদর্শনী’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় ১১টা ৫৯ মিনিটে। এরপর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রদর্শনীতে নেতৃত্ব দেওয়া বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তাদের সামনে গিয়ে তাদের সঙ্গে হাত মেলান। রাষ্ট্রপতিকে বিদায় জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিন বাহিনীর প্রধানগণ সঙ্গে ছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং হাত মেলান। মনোজ্ঞ এ আয়োজন প্রধানমন্ত্রীর পাশে বসে উপভোগ করেন তার কন্যা জাইমা রহমান।

কুচকাওয়াজ প্রদর্শনী উপভোগ করতে শিশু-কিশোরসহ নানান বয়সী হাজারো দর্শণার্থী জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে জড়ো হন। দর্শনার্থীদের অনেকের হাতে ও মাথায় শোভা পায় লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ শেষে সশস্ত্র বাহিনীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। দীর্ঘ ১৮ বছর পর মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে এই বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হলো। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি এ কথা জানান। এবারের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও সামরিক সক্ষমতার এক অনন্য প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। এমন চমৎকার আয়োজনে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠান শেষে প্যারেড স্কয়ার ত্যাগের সময় উপস্থিত সশস্ত্র বাহিনী সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ও প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। ১৯৭১ সালের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বৃহস্পতিবার ভোর ৬টার দিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করেন।

এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে স্মৃতিসৌধ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে সকাল থেকেই পুরো এলাকা মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। উল্লেখ্য, ৮৪ একরজুড়ে বিস্তৃত জাতীয় স্মৃতিসৌধ।

এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়া করেন। তার সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মী ও সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে তারেক রহমানের শ্রদ্ধা : মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় রাজধানীর জিয়া উদ্যানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নেতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় তাদের জন্য দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।

এর আগে সকাল ৬টায় সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শ্রদ্ধা শেষে সেখান থেকে ঢাকায় ফিরে সকাল ৭টার মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি।