গাইবান্ধা সংবাদদাতা : এক সময়ের প্রাণচঞ্চল, উত্তরবঙ্গ ও রাজধানীর যোগাযোগের প্রধানতম প্রবেশদ্বার গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাট আজ তার ঐতিহাসিক জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছে। যেখানে একসময় ফেরি, জাহাজ ও ট্রেনের হুইসেলে মুখরিত থাকত নদীর কূল, সেখানে এখন শুধুই নীরবতা আর স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস। যমুনা নদীর ভাঙন এবং কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নদীবন্দর ও রেলওয়ে ঘাটের অতীত গৌরব। তবে নদী যেন এখানকার জীবনের অন্য নাম। সময়ের স্রোতে জৌলুশ কিছুটা ফিকে হলেও গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাটে যমুনার স্রোতের সঙ্গে মিশে আছে চরের মানুষের দিনযাপন। ফুলছড়ি ঘাট: যেখানে শুধুই পারাপার, মাছ ধরা আর শিশুদের ছুটোছুটি-সব মিলিয়ে এই ঘাট আজও নদীকেন্দ্রিক এক জীবন্ত দৃশ্যপট। ফুলছড়ি ঘাট ছিল বাংলাদেশের যোগাযোগ ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। এটি মূলত বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটের বালাসী অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর ওপর দিয়ে এই ঘাটই ছিল উত্তরের জেলাগুলোর সঙ্গে ঢাকার রেল ও সড়ক যোগাযোগের প্রধানতম কেন্দ্র। ১৯৩৮ সাল থেকে এই রুটে ট্রেনের যাত্রীবাহী বগি এবং পণ্যবাহী ওয়াগন ফেরি করে নদীর ওপারে (দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাট) নিয়ে যাওয়া হতো। এর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি গতি পেত। হাজার হাজার যাত্রী প্রতিদিন এই ঘাট ব্যবহার করতেন। ঘাটে সবসময়ই লেগে থাকত ভিড়, চাঙা ছিল স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। মাঝরাতে ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীর কোলাহল আর ফেরির ইঞ্জিনের শব্দে মুখরিত থাকত এখানকার পরিবেশ। তিস্তামুখঘাট এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি ছালাম মিয়া (৬৫) বলেন, ফুলছড়ি ঘাটের গুরুত্ব কমে যাওয়ার কারণগুলো হলো, ১৯৯৮ সালে যমুনা নদীর উপর বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর সড়কপথে দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতি বছর নদীর তলদেশে ব্যাপক হারে পলি জমে এই রুটে নাব্যতা সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে, যা বড় নৌযান চলাচলের অনুপযোগী করে তোলে। সেতুর কারণে গুরুত্ব কমে যাওয়া এবং নাব্যতা সংকটের ফলে ২০০৫ সালের দিকে বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে মূল ফেরি সার্ভিস ও রেলওয়ে যোগাযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আরেক প্রবীণ ব্যক্তি সামছুল সরকার (৭০) বলেন, এ ঘাটে এখন আর দূরপাল্লার ফেরি কিংবা রেলওয়ে কর্মীদের ব্যস্ততা চোখে পড়ে না। বর্তমানে এই ঘাট কেবল একটি সাধারণ খেয়াঘাটে পরিণত হয়েছে। চরে বসবাসকারী স্থানীয় মানুষজন আর কৃষকরাই কেবল পণ্য আনা-নেওয়া কিংবা নদী পারাপারের জন্য ছোট নৌকা বা ট্রলার ব্যবহার করেন। স্থানীয়রা মনে করেন, এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটির নাম ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব টিকিয়ে রাখতে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাটে যমুনার স্রোতের সঙ্গে মিশে আছে চরের মানুষের দিনযাপন।
গ্রাম-গঞ্জ-শহর
ফুলছড়ি থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট নৌবন্দরটি চালু করার দাবি
এক সময়ের প্রাণচঞ্চল, উত্তরবঙ্গ ও রাজধানীর যোগাযোগের প্রধানতম প্রবেশদ্বার গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাট আজ তার ঐতিহাসিক জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছে।
Printed Edition