রাজশাহীর তানোরে গভীর নলকূপের জন্য খুঁড়ে রাখা গর্তে পড়ে এক শিশু নিহত হওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনার জের ধরে বরেন্দ্র অঞ্চলের সেচব্যবস্থা নিয়ে নানাপ্রকার অনিয়মের তথ্য উঠে আসছে। এসব পরিত্যক্ত গর্ত যেন একেকটা মৃত্যুফাঁদ হিসেবে থেকে গেছে। অন্যদিকে এই অঞ্চলে সেচব্যবস্থা নিয়ে একপ্রকার ‘ব্যবসা’ চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই এরকম প্রায় আড়াই হাজার অগভীর নলকূপ সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।
বরেন্দ্রভুক্ত রাজশাহীর গোদাগাড়ী, তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও নাচোল এবং নওগাঁর নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার উপজেলায় পানির স্তর প্রতিদিন নিচে নামছে বলে আশঙ্কাজনক তথ্য ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার পেয়েছে। কিন্তু এর প্রতিকারের বিষয়টি কৃষক-চাষি তথা মাঠ পর্যায়ে উপেক্ষিত থেকে গেছে। সম্প্রতি পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থার পক্ষ থেকে রাজশাহী অঞ্চলের তিন জেলার ২৫টি উপজেলা এলাকাকে অতি উচ্চ পানি সংকট এলাকা ঘোষণা করা হয়। তবু থেমে নেই নলকূপ বসানোর কাজ। নামতে নামতে একটা সময় আর পানিই পাওয়া যাচ্ছে না। তখন নলকূপ তুলে অন্য জায়গায় বসানো হচ্ছে। এতে তৈরি হয়েছে শত শত মৃত্যুফাঁদ। সেই ফাঁদের গর্তে পড়ে মারা যায় শিশু সাজিদ। এদিকে যিনি গর্তটি খুঁড়েছিলেন, সেই কছির উদ্দিন ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে আছেন। উপজেলা সেচ কমিটির অনুমোদন না নিয়েই অবৈধভাবে তিনি ওই গর্ত খুঁড়েছিলেন বলে অভিযোগ মিলেছে।
সূত্রে জানা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামতে থাকায় ২০১৫ সালে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সিদ্ধান্ত নেয় নতুন করে কোনো গভীর নলকূপ বসাবে না। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা আর গভীর নলকূপ বসাচ্ছেও না। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানায় সেমিডিপ বসানোর কাজ থেমে নেই। নলকূপ স্থাপনের ক্ষেত্রেও পানি পেতে একাধিক জায়গায় খনন করা হয়। তখন পড়ে থাকছে পরিত্যক্ত গর্তটি। এ রকম শত শত পরিত্যক্ত গর্ত রয়েছে এই অঞ্চলে। এগুলোর ব্যাসার্ধ ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি। যা তৈরি করা আছে মৃত্যুফাঁদ হিসেবে। শুধু সেচের পানি বিক্রির জন্য এগুলো তৈরি করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা।
নিয়মনীতির তোয়াক্কা নেই
বরেন্দ্র অঞ্চলে মূলত কৃষকদের সেচ দেয়ার কাজটি করে থাকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। কৃষিজমিতে সেচের জন্য এই অঞ্চলে তাদের কয়েক হাজার গভীর নলকূপ রয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আরো কয়েক হাজার নলকূপ বসানো হয় ব্যক্তিমালিকানায়। বিদ্যমান সেচ আইন অনুযায়ী বিএমডিএ’র অধিক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানার গভীর বা অগভীর নলকূপ স্থাপনের সুযোগ নেই। তারপরও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে স্থানীয় সেচ কমিটিকে ম্যানেজ করে এসব অনুমোদন দেয়া হয়। গত বছর কেবল তানোরেই ৩২টি অগভীর নলকূপ বসানোর অনুমোদন দেয়ার কথা জানা যায়। এধরণের অনুমোদনহীন অগভীর নলকূপের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার বলে জানা গেছে। এভাবে রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপজেলাগুলোতে সেচ কমিটির অনুমোদন ছাড়া শত শত অগভীর নলকূপ চলছে। এগুলো থেকে ৩০ থেকে ৪০ বিঘা পর্যন্ত জমিতে সেচ দেয়া যায়। কোথাও মুরগির খামার, কোথাও আবাসিক কিংবা ক্ষুদ্রশিল্পের নামে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়ে নলকূপ বসিয়ে সেচপাম্প চালাচ্ছেন অনেকেই। এসব উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানি কমছেই। কোথাও কোথাও মাটির ২০০ ফুট গভীরে পানির স্তর পাওয়া যায় না। তাই এই তিন জেলার চার হাজার ৯১১ মৌজায় এখন খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি তোলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। তবু ব্যক্তিমালিকানায় অগভীর নলকূপ বসানো থেমে নেই। একজন উন্নয়নকর্মী বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি দামি ব্যবসা। এখান থেকে ভালো মুনাফা হয়। অন্তত ৭৫ শতাংশ লাভ। তাই অবৈধভাবে অগভীর নলকূপ বসানোর প্রতিযোগিতা চলছে। বিএমডিএ’র যতো গভীর নলকূপ রয়েছে, তারও বেশি আছে অগভীর নলকূপ। মাটির নিচে পানির নাগাল না পেয়ে এক স্থান থেকে অগভীর নলকূপ সরিয়ে অন্য জায়গায় বসানো হচ্ছে। এটাকে রিবোরিং বলা হয়। খুঁজলে দেখা যাবে, তিন ভাগের এক ভাগ অগভীর নলকূপ এভাবে স্থান বদল করেছে। স্থান পরিবর্তনের পর পাইপের গর্তটিও অনেক স্থানে থেকে গেছে। আবার নতুন অগভীর নলকূপ বসানোর সময় নিচে পানির লেয়ার পাওয়া যায় না। তখন এক স্থান বোরহোলের পর আবার অন্য স্থানে বোরহোল করতে হয়। এভাবে পানির সংকটে থাকা এলাকাগুলোতে শত শত গর্ত আছে। যেগুলোতে ঘটছে দুর্ঘটনা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানি ব্যবসায় ভালো লাভ হওয়ায় প্রায় এক বছর আগে শিশু সাজিদদের বাড়ির পাশে নিজের জমিতে আরেকটি অগভীর নলকূপ বসানোর চেষ্টা করেন কছির উদ্দিন। এজন্য পর পর তিনটি স্থানে মিস্ত্রিদের দিয়ে বোরহোল করান। কিন্তু ৯০ ফুটের পরও সেখানে পানি পাওয়া যায়নি। বরং বোরহোলের পাইপ দিয়ে পাথর উঠে আসছিল। তাই এখানে নলকূপ বসানো হয়নি। তারপর সামান্য খড়কুটা ও মাটি দিয়ে বোরহোলের মুখ ঢেকে দেয়া হয়েছিল। সম্প্রতি বৃষ্টিপাতে এলাকাটি তলিয়ে যায়। তখন বোরহোলের মুখের মাটি ও খড় পানির সঙ্গে নিচে নেমে গেলে বোরহোলের মুখ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এতে পড়ে যায় শিশু সাজিদ। এই দুর্ঘটনা দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। অতঃপর এভাবে খোঁড়া উন্মুক্ত গর্তে দুর্ঘটনা রোধে উদ্যোগ নেয়া হয়। ইতোমধ্যে রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলার জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে সব নলকূপের তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।