ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায়ও। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একদিকে বেশি দামে এলএনজি ও এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে ক্রুড অয়েলবোঝাই দুটি জাহাজ দেশে আনার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, সৌদি আরব থেকে প্রায় ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে ‘এমটি নর্ডিক পলাঙ’ নামের একটি অয়েল ট্যাংকার চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার আগে রাস তানুরা বন্দরে আটকা পড়ে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জাহাজটি এখনো বন্দরে নোঙর করে আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এটি যাত্রা করতে পারবে না।

এ ছাড়া দুবাইয়ের জেবল আলী বন্দর থেকে ‘এমটি ওমেরা গ্লাস্কি’ নামের আরেকটি অয়েল ট্যাংকারের আগামী ২২ মার্চ প্রায় ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা রয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই জাহাজটির যাত্রাও বিলম্বিত হতে পারে।

বিপিসি জানিয়েছে, ক্রুড অয়েলবাহী এই দুটি জাহাজ দেশে পৌঁছাতে না পারলে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার টন ক্রুড অয়েল মজুত রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হয়। এই মজুত দিয়ে আগামী ৩ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার টন ডিজেল, প্রায় ১ হাজার ১০০ টন ফার্নেস অয়েল এবং ৩০০ থেকে ৪০০ টন পেট্রোল উৎপাদন করা হয়। এছাড়া জেট ফুয়েল, এলপিজি ও বিটুমিনসহ বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন হয়। তবে এখানে অকটেন উৎপাদন করা হয় না।

দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয় এবং বাকিটা পরিশোধিত অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে পরিশোধিত তেল আনার পরিকল্পনাও ব্যাহত হচ্ছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এদিকে সম্ভাব্য সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল কিনতে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেকেই নিজ নিজ গাড়ি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন জ্বালানি নেওয়ার জন্য। একই চিত্র দেখা গেছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও।

একাধিক ক্রেতা জানান, সামনে তেলের সংকট হতে পারে-এমন খবর শুনে অনেকেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন। নগরীর একটি পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে আসা এক গ্রাহক বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের সংকট হতে পারে বলে শুনেছেন। তাই তিনি গাড়ির ট্যাংক পূর্ণ করে নিচ্ছেন।

পাম্প মালিকদের ভাষ্য, পাম্পগুলোতে এখনো তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ক্রেতারা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল কিনে নেওয়ায় মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে। বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে দেশে তেলের বড় ধরনের কোনো সংকট নেই। অনেকেই আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল কিনছেন, যাকে ‘প্যানিক বায়িং’ বলা হচ্ছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আগামী মাসে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে।

বিপিসির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ জ্বালানি মজুত রয়েছে, তাতে ডিজেল প্রায় ১৪ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, অকটেন ২৮ দিন, জেট ফুয়েল ৫৫ দিন এবং ফার্নেস অয়েল প্রায় ৯৩ দিন চলবে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ ১০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে এবং সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি ছাড়া চট্টগ্রামসহ অন্যান্য সার কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি সংকট এড়াতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে খোলাবাজার থেকে এলএনজি সংগ্রহ করছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি ভিটল এশিয়া প্রতি ইউনিট এলএনজি প্রায় ২৪ দশমিক ৫ ডলার দরে সরবরাহ করবে, যা আগামী ২০ মার্চ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। অন্যদিকে গানভর নামের আরেকটি কোম্পানি প্রতি ইউনিট প্রায় ২৮ ডলার দরে এলএনজি সরবরাহ করবে, যার কার্গো ১৭ মার্চ আসার কথা রয়েছে। যুদ্ধের আগে একই এলএনজি প্রায় ১০ ডলার দরে কেনা হতো।

এদিকে এলপিজি সরবরাহ নিয়েও কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম তেমন না বাড়লেও জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আমদানির খরচ বেড়েছে। এর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ‘ফ্রেশ’ ব্র্যান্ড এ মাসে প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি করছে। তবে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এপ্রিল মাসে এলপিজি সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে।

সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে। জনগণকে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমানো, ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার এবং কারপুলিং ব্যবস্থার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় আরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।