খুলনা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র ডাকবাংলো মোড়ে সন্ত্রাসীদের গুলীতে রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহ (৪৮) হত্যাকান্ডের ঘটনায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা হয়েছে। সিসি টিভি’র ফুটেজ ও উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, মাসুম বিল্লাহকে হত্যার জন্য ৫০ হাজার টাকা কন্ট্রাকে একটি বিশেষ গ্রুপের ৮ সদস্য কিলিং মিশনে অংশ নেয়। এর মধ্যে দুই জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সূত্র জানায়, হত্যাকান্ডে অংশ নেয় সন্ত্রাসীদের তিনটি গ্রুপ। পূর্ব শত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অন্য সদস্যদের গ্রেফতারে আটক অশোক ঘোষকে নিয়ে নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ মহানগরীর সোনাডাঙ্গা ট্রাক টার্মিনাল ২২ তলা ভবনের পাশ থেকে মো. জাবেদ গাজী নামে আরেকজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ। আটক জাবেদ ট্রাক টার্মিনাল এলাকার বাসিন্দা আশরাফ আলীর ছেলে।
কেএমপি উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মাদ তাজুল ইসলাম বলেন, হত্যার পরিকল্পনা করা হয় অনেক আগে থেকে। বিভিন্ন সময় হত্যাকারীরা সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু গত বুধবার রাতে সে সময় তাদের হয়ে যায়। মাসুম হত্যা মিশনে সন্ত্রাসীদের তিনটি গ্রুপ কাজ করেছে। তাদের মধ্যে একটি গ্রুপ মাসুমের গতিবিধি খুনিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। অপরটি মিশনে অংশ নেওয়া সদস্যদের কাজ হওয়ার পর নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া। অন্য গ্রুপটি হত্যা মিশন সফল করবে।
তিনি বলেন, হত্যা মিশনে ৮ জন সদস্য ছিল। তারা সকলে গল্লামারি থেকে ময়লাপোতা মোড়ে মিলিত হয়। সেখান থেকে অস্ত্র নিয়ে তারা ডাকবাংলো মোড়ে আসে। সন্ধ্যার পর মাসুমসহ পরিবারের সদস্যরা কেনাকাটার জন্য মার্কেটে আসেন। এ তথ্য দেওয়ার পর হত্যাকারীরা মাসুমকে প্রথমে ধাওয়া দেয়। তাদের ধাওয়া খেয়ে মাসুম নিরাপত্তার জন্য ডাকবাংলো মোড় বাটার শো-রুমে প্রবেশ করে। পিছু নিয়ে সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার শরীরে একাধিক স্থানে আঘাত করতে থাকে। পরে তাকে লক্ষ্য করে গুলী করে দু’জন সন্ত্রাসী।
তিনি আরও বলেন, এর আগে হত্যা মিশন সম্পন্ন করার জন্য অশোক ঘোষকে ৫০ হাজার টাকার দেওয়া হয়। মিশন শেষ করার পর তারা যে যার মতো করে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যায়। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া সদস্যদের নাম জানতে পেরেছি। তাদের গ্রেফতারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। আরও কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করতে পারলে হত্যার মূল মোটিভ বের হয়ে আসবে।
অশোককে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। রাতে সোনাডাঙ্গা থেকে জাবেদ গাজীকে আটক করা হয়। সে ব্যাক আপ অংশের সদস্য ছিল। নিহতের পরিবার মামলা করলে তাকেও আসামী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে তিনি বলেন, অশোক সন্ত্রাসীদের একটি গ্রপের সদস্য। নিজেদের অস্ত্র আছে।
খুলনা সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন বলেন, আটক অশোকের বিরুদ্ধে খুলনা থানার এসআই আমিরুল বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করেছেন। অশোক ঘোষ একজন কনট্রাক্ট কিলার। এ হত্যাকাণ্ডের জন্য সে ৫০ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে সে কিন্তু তদন্তের স্বার্থে কোনো কিছু প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে মাছুম বিল্লার বাড়িতে গিয়ে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক ও বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। এ সময় তিনি বলেন, খুলনা এখন খুনের নগরীতে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো জোরদার করতে হবে। খুলনা শহরে প্রায়ই হত্যা, খুন ও হামলার ঘটনা ঘটছে। খুলনার মানুষ নিরাপদে থাকতে চায়। তাই সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দায়িত্বের প্রতি আরো সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পরিশেষে তিনি বলেন, মাসুম বিল্লাহ হত্যাকান্ডে যারা জড়িত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যদি কঠোর ভূমিকা পালন করে তাহলে সন্ত্রাসীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।
নিহত মাসুম বিল্লাহ’র বড় ছেলে আবিদ হোসাইন বলেন, এ ঘটনায় এখনো মামলা দায়ের করা হয়নি। তিনি বলেন, সিসি টিভির ফুটেজ দেখে পুলিশ গ্রেনেড বাবু গ্রুপের সদস্য সনাক্ত করতে পারলেও মিশনে অংশ নেওয়া বাকি সদস্যদের এখনো আটক-গ্রেফতার করতে পারেনি। তিনি তার পিতা হত্যাকান্ডে জড়িত সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। হত্যাকান্ডের বিষয়টি যাতে বিএনপি’র চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পৌঁছায় এ ব্যাপারে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
নিহত মাসুম বিল্লাহ’র বড় ভাই রূপসা বাগেরহাট বাস মিনিবাস চেয়ার কোচ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিএনপি নেতা মো. মহিউদ্দিন শেখ বলেন, হত্যাকান্ডের পর থেকে তাদের পরিবার-পরিজন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি বলেন, হত্যাকারীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, ময়নাতদন্ত শেষে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নিহত মাসুম বিল্লাহ’র জানাযা শেষে রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মৃত্যুকালে মাসুম বিল্লাহ স্ত্রীসহ, দুই ছেলে, এক মেয়ে আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মাসুম বিল্লাহ কর্মজীবনে একজন প্রতিষ্ঠিত মৎস্য ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতা ছিলেন। এছাড়া রূপসা-বাগেরহাট আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচিত সাবেক সভাপতি ছিলেন। বাজনৈতিক জীবনে তিনি জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী ছিলেন। নিহত মাসুম বিল্লাহ রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামের মৃত মিনহাজ উদ্দীন মুন্সী ওরফে মীনা মুন্সীর পুত্র। তিনি দুটি হত্যা মামলার আসামী ছিলেন এবং আগে র্যাবের হাতে অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাঁর বড় ভাই নৈহাটি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল ওরফে মিনা কামাল ২০২০ সালে র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।