একেএম আবদুর রহীম, ফেনী: গত বছর আগস্টে ফেনী সীমান্ত দিয়ে ভারতের চাপিয়ে দেয়া ঢলের পানি প্রবেশ করে বাংলাদেশের কয়েকটি জেলা প্রবল বন্যায় প্লাবিত করে। ওই সময় বিএসএফ ফেনীর বল্লামুখ বেড়িবাঁধ কেটে দিয়ে ফেনীতে স্মরনকালের ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। যার ফলে ৩৭ জন মানুষ প্রান হারান। হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর তড়িঘড়ি বেড়িবাঁধটি সংস্কারে উদ্যোগ নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে বর্তমানে ওই সংস্কারকাজে চলছে নানা অনিয়ম। এক হাজার ৩৯০ মিটার বেড়িবাঁধ সংস্কারে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মিটারে এক লাখ টাকা। চার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় কার্যাদেশ। যাদের কেউ ফেনীর না।

চার কোটি ১৭ লাখ টাকায় ১৯০ মিটারের কাজ করছে চট্টগ্রামের ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স, এক কোটি ৪২ লাখ টাকায় ৭০ মিটারের কাজ করছে কুষ্টিয়ার নাসির উদ্দিন মোল্লা, দুই কোটি ৯০ লাখ টাকায় ৪৫০ মিটারের কাজ করছে রংপুরের ইউনাইটেড ব্রাদার্স এবং পাঁচ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় ৬৮০ মিটার জিও ব্যাগের কাজ করছে ঢাকার ‘ভিশন ২০২০’। তবে প্রকল্প এলাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর মাধ্যমে দায়সারা চলছে প্রকল্পের কাজ। পাউবোর নথিতে দেখা যায়, কাজ শেষ না হলেও বরাদ্দের বড় একটি অংশ এরই মধ্যে অগ্রিম দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জমির মালিকদের অভিযোগ, কিছু লোক হুমকি-ধমকি দিয়ে ক্ষতিপূরণ না দিয়েই জোর করে তাদের জমির মাটি কেটে নিচ্ছে। ভারতে ফের বন্যা দেখা দিলে আবারও বানের পানিতে ভাসতে হবে এমন আশঙ্কা তাদের।

বল্লামুখ বেড়িবাঁধ সংস্কার প্রকল্পের ভূতুড়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং টেন্ডার কেনাবেচনার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, তিনি এখানে নতুন এসেছেন। ফলে কোনো তথ্য দিতে পারবেন না। একইভাবে সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার শিহাব আহমেদ যুক্তি দেখান, ‘তথ্য দিলে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। এরপর বেরিয়ে আসে অনেক তথ্য।

গত ১২ অক্টোবর সরেজমিন গিয়ে প্রকল্পের বেহাল দশা দেখা যায়। এরপর নথিপত্র হাতে এলে ফের গত ২৭ নভেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঝখানে ৪৫ দিন পার হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বেড়িবাঁধের জিও ব্যাগ ঠিকমতো ফেলা হচ্ছে না। ব্লক দেওয়া হচ্ছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এসব ব্লকও নিম্নমানের।

সরেজমিনে বল্লামুখ বাঁধের কাছে ‘৭০ মিটার প্রকল্পের’ কাজ তদারকি করতে দেখা যায় কাজী আমিনুল ইসলাম রসুল নামের ফুলগাজীর এক ব্যক্তিকে। তবে তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম বলতে পারেননি। কুষ্টিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে পরশুরামের আব্দুল হালিম কাজ করছেন বলে জানান এলাকাবাসী। যোগাযোগ করা হলে আব্দুল হালিম আরো কিছু নাম বলেন। যার মধ্যে আছেন ফুলগাজীর আবুল হোসেন চেয়ারম্যান এবং ঠিকাদার মিয়া নামের পরিচিত ফুলগাজী উপজেলার মো. মিয়া।

মো. মিয়া বলেন, ‘ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবেই।’ আর হোসেন চেয়ারম্যান বলেন, ‘বেড়িবাঁধের স্থানে আমি যাইনি।’ তাঁদের নিজস্ব লাইসেন্স না থাকায় পরশুরামের আবু তালেবের নেতৃত্বে আব্দুল হালিমসহ তিনি কাজগুলো সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে করছেন।

চট্টগ্রামের ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স ও রংপুরের ইউনাইটেড ব্রাদার্সের সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে আবু তালেবের নাম শোনা যায়। তবে আবু তালেব দাবি করেন, তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে চেনেন না। প্রশাসন তাঁকে বলেছে কাজে সাহায্য করতে। ‘৬৮০ মিটার প্রকল্পে’ জিও ব্যাগ ফেলার কাজ পেয়েছে ঢাকার ভিশন ২০২০। এই কাজের সঙ্গেও মো. মিয়া এবং শাহীন নামের এক ব্যক্তির নাম যুক্ত।

নথিপত্র বলছে, ঢাকার ভিশন ২০২০ চুক্তিবদ্ধ হয় চলতি বছরের ১১ মার্চ থেকে ১০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার। মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো কাজ শেষ করতে পারেনি। ইউনাইটেড ব্রাদার্সেরও ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ নভেম্বরের মধ্যে কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু এখনো কাজ অনেক বাকি। ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স ১ জানুয়ারি কাজ শুরু করে ১৫ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। এই সময়ের পাঁচ মাস পরও দেখা গেছে শম্ভুকগতিতে চলছে কাজ। ‘নাসির উদ্দিন মোল্লা’র সঙ্গে চুক্তি হয় ৯ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুনের মধ্যে কাজ পাউবোকে বুঝিয়ে দেওয়ার। কিন্তু কাজ এখনো চলমান।বিজিবির ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘বাধটি শূন্য গজের মধ্যে পড়েছে বলে দুই দেশের সমন্বয়ের ব্যাপার আছে। এ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ চলমান আছে।’