মোঃ রফিকুল ইসলাম, কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) : ফাগুন এলেই যেন আগুন জ্বলে ওঠে প্রকৃতির শরীরে। বাংলাদেশ-এর দক্ষিণ অঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জে প্রকৃতিতে এখন সেই আগুনেরই দৃশ্যমান বিস্ফোরণ। গ্রামবাংলার মাঠ, পথঘাট আর নিঃসঙ্গ প্রান্তরে ডালে ডালে ফুটে ওঠা রক্তিম শিমুল ফুল যেন প্রকৃতির এক তীব্র ঘোষণা বসন্ত এসেছে, প্রকৃতি এখনো বেঁচে আছে, এখনো হার মানেনি।

সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা, তেতুলিয়া, ভাড়াশিমলা, কুশুলিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় এখন চোখে পড়ছে আগুনরাঙা শিমুলের অপরূপ শোভা। পাতাহীন গাছের প্রতিটি ডাল যেন লাল শিখায় জ্বলে উঠেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, গাছের মাথায় আগুন জ্বলছে। সুবাস না থাকলেও এর উজ্জ্বল রঙ আর সৌন্দর্য মুহূর্তেই দৃষ্টি কেড়ে নেয় পথচারীদের।

কালিগঞ্জ উপজেলার স্থানীয় প্রবীণ মানুষেরা জানান, এক সময় কালিগঞ্জ এলাকার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই শিমুল গাছ ছিল প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে, মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুল গাছ বসন্তের আগমনী বার্তা বহন করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নির্বিচারে গাছ কাটা, পরিবেশের পরিবর্তন এবং মানুষের অবহেলায় শিমুল গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

কালিগঞ্জ উপজেলার মথুরেশপুর গ্রামের মোঃ শাহাদাত হোসেন বলেন, “ছোটবেলায় গ্রামের চারদিকে অসংখ্য শিমুল গাছ দেখতাম। এখন হাতে গোনা কয়েকটা গাছ দেখা যায়। যখন ফুল ফোটে, তখন মনে হয় প্রকৃতি আবার বেঁচে উঠেছে।” উপজেলার রতুনপুর গ্রামের মানিক আলী মোড়ল জানান, সাধারণত জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে শিমুল ফুল ফোটা শুরু হয় এবং ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে তা পূর্ণ রূপ ধারণ করে। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় ফুল ফোটার সময় কিছুটা এগিয়ে বা পিছিয়ে যায়।

শিমুল শুধু একটি ফুল নয়, এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর আবেগের প্রতীক। যুগে যুগে কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীরা শিমুল ফুলের সৌন্দর্যে অনুপ্রাণিত হয়ে সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য কবিতা, গান ও গল্প। নিঃসঙ্গ পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি শিমুল গাছ যেন একেকটি জীবন্ত শিল্পকর্ম, যা নীরবে বলে যায় ঋতু পরিবর্তনের গল্প।

তবে পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে শিমুল গাছ শুধুই স্মৃতিতে পরিণত হবে। তারা শিমুলসহ দেশীয় গাছ সংরক্ষণ ও রোপণে সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। ফাগুনের আগুনরাঙা এই শিমুল আজ শুধু বসন্তের সৌন্দর্যই নয়, বরং প্রকৃতির অস্তিত্ব রক্ষার এক নীরব সংগ্রামের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।