* আবারও প্রতারণার আশঙ্কা শ্রমিকদের
* ২৫ এজেন্সির সরকার ম্যানেজ করার চেষ্টা
* সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত হচ্ছে না
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে এবার নতুন করে প্রতারণা শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও বাংলাদেশের নতুন সরকারের যাত্রা শুরুকে কাজে লাগিয়ে পুরানো সিন্ডিকেট এবার নতুন করে মাঠে নেমেছে। মালয়েশিয়ার সিন্ডিকেট বাংলাদেশি চিহ্নিত সিন্ডিকেটের হোতাদের যোগসাজশে দ্রুত শ্রমবাজার খোলার প্রলোভন দেখিয়ে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। এতে শূন্য খরচে কর্মী প্রেরণ এবং সম্প্রতি গ্রেফতার জেনারেল (অব) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ একশ’ এজেন্সির বিরুদ্ধে হওয়া মামলা প্রত্যাহারেরও প্রস্তাব দেয়া হয়। তবে এ ধরনের প্রস্তাবকে একটি ফাঁদ বলে মনে করছেন শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা।
সূত্রমতে এরআগেও অল্প খরচে মালয়েশিয়া পাঠানোর নামে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। সরকারি খরচ ৪৭ হাজার এবং ৭৯ হাজার টাকায় মালয়েশিয়া কর্মী পাঠানোর কথা বলে সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়ে কর্মী পাঠানো হয়েছে মালয়েশিয়ায়। এবারও একধরণের টোপ দিয়ে নতুন করে পুরানো সিন্ডিকেট বাজার দখলের পায়তারা শুরু করেছে।
সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছে-মালয়েশিয়ান পর্যায়ের প্রধান ছিলো বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত মালয়শিয়ায় নাগরিক ধাতুশ্রী আমিনুর আর বাংলাদেশে নেতৃত্বে ছিলো মোহাম্মদ রুহুল আমিন স্বপন, মোহাম্মদ নূরু আলী ও তাদের সহযোগীরা। এছাড়াও ছিলো জাফরুল ইসলাম (জাফর), গোলাম মোস্তফা, কাজী মফিজ, লোটাস কামাল, রিব্বির বশির , এই. এস. এমটির আমি, আরিফ (লোটাস কামালের শালা) রুহুল আমিন (আমিন ট্যুর)। এরা আবার সক্রিয় হচ্ছে শ্রমবাজার দখলের জন্য।
২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুরোপুরি বন্ধ ছিলো। কোন কর্মী এই সময়ে মালয়েশিয়া যেতে পারেনি। অনেক আলাপ আলোচনার পর ২০১২ জি টু জি পদ্ধতিতে বাজারটি পুনরায় চালু করা হয়। এ সময় সরকার ৮০০০ কর্মীও পাঠাতে পারেননি। সরকার মালয়েশিয়ান চাহিদা মিটাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এই সময়ে মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী চাহিদা ছিলো প্রায় ১.৫ মিলিয়ন। ২০১২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত জি টু জির ব্যর্থতাকে পুঁজি করে ২০১৬ সালে নতুন করে জি টু জি প্লাস চুক্তি করা হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে সরকারের পাশাপাশি সীমিতসংখ্যক বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী প্রেরণের সুযোগ দেয়া হয়। ২০১২ সালের জি টু জি ও ২০১৬ সালের জি টু জি প্লাস চুক্তি দুইটা ছিলো দেশ, অভিবাসী কর্মী ও রিক্রুটিং এজেন্সির স্বার্থবিরোধী। এই দুই চুক্তির কারণে লাখ লাখ কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারেনি এবং যারা গিয়েছে তারা সরকারের নির্ধারিত ফির তুলায় অনেক গুন বেশি টাকা দিয়ে মালয়েশিয়ায় যেতে বাধ্য হয়েছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে সক্রিয় রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ছিলো প্রায় ১২০০, কর্মী রপ্তানি করতে পেরেছে মাত্র ১০টি এজেন্সি। দশ এজেন্সি মিলে একটি সিন্ডিকেট গঠন করে, তারাই একচেটিয়া ভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারকে নির্ধারিত অভিবাসন ফি ছিলো কর্মী প্রতি ৪৭ হাজার টাকা, কিন্তু তারা নিয়েছে প্রতিটি কর্মী থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা করে। সিন্ডিকেটের ফি ছিলো ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ব্যাপক অনিয়ম ও অতিরিক্ত অভিবাসন ফি আদায় করার কারণে মালয়েশিয়ান সরকার ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাজারটি বন্ধ করে দেয়। ১০ জনের সিন্ডিকেটের মালয়েশিয়ান পার্টের প্রধান ছিলো বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত মালয়শিয়ায় নাগরিক ধাতুশ্রী আমিনুর আর বাংলাদেশে নেতৃত্ব ছিলো মোহাম্মদ রুহুল আমিন স্বপন এবং তাদের সহযোগীরা। এই সময়ে কর্মী রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার। ৪ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। এর বাইরে আছে টিকেট, চাহিদা পত্র সংগ্রহ খরচ, মেডিকেল খরচ, ভিসা ফি, ম্যান পাওয়ার ফি ও এজেন্সির মুনাফা। সরকারের নির্ধারিত ফি ৪৭,০০০ টাকা। কর্মীদের থেকে আদায় করা হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে ৪ লাখ টাকা। কর্মী রপ্তানি করা হয়েছে ২,৭৬,০০০ জন। মেডিকেল করানো হয়েছে ১৫,০০০০০ টাকা। মেডিকেল খরচ ১০০০ টাকা আদায় করা হয়েছে ৭০০০ টাকা। নিষ্ঠুর ভাবে অভিবাসী কর্মীদেরকে শোষণ করা হয়েছে। প্রতিবাদ করে মামলাও করা হয়েছে কিন্তু কোন কাজ হয়নি। উল্টো হয়রানি শিকার হয়েছে প্রতিবাদকারীরা। ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বরের পুরাতন সিন্ডিকেট পদ্ধতি বহাল রেখে বাজারটি পুনরায় চালু করা হয়।
ব্যতিক্রম ছিল সিন্ডিকেটের সদস্য সংখ্যা, ২০১৬ সালে সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলো ১০ জন, ২০২১ সালে সিন্ডিকেটের সদস্য প্রথমে ছিলো ২৫ জন , পরে বোয়েসেল সহ এই সংখ্যা এসে দাড়ায় ১০১ জনে। এই পিরিয়ডে বৈধ লাইসেন্সের সংখ্যা ছিলো ১৫২০. কর্মী রপ্তানি করতে পেরেছে ১০১ জন। সিন্ডিকেট ফি ১৫২০০০ টাকা জন প্রতি। ৩১ মে ২০২৪ পর্যন্ত কর্মী রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৫০০০০০। শুধুমাত্র সিন্ডিকেট ফি আদায় করা হয়েছে ৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
সরকারকে নির্ধারিত ফি ছিলো ৭৯,০০০ টাকা। প্রতিটি কর্মী গিয়েছে গড়ে ৫০,০০০০ টাকা করে। প্রতি কর্মী থেকে অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে ৪২১০০০ টাকা। মেডিকেল করানো হয়েছে ২৫ লাখ কর্মী। ফ্যাসিবাদী সরকার এই লুটপাটের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার কারণে এইবার তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারিনি। সিন্ডিকেট করে ব্যবসা করা অবৈধ, অন্যায়, কিন্তু ফ্যাসিস্ট হাসিনা অন্যায়কে ন্যায়তে পরিনত করেছে। মালয়েশিয়ান সরকার তাদের প্রয়োজনে বাজার উন্মুক্ত করে। প্রতিটি দেশের জন্য বাজার উন্মুক্ত করা হয়। দুঃখের বিষয় কোন দেশ থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মী রপ্তানি হয়নি শুধুমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া। সিন্ডিকেটের হোতারা দুই দেশের মন্ত্রী ও আমলাদেরকে কোট কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে সীমিত সংখ্যক অর্থাৎ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার উন্মুক্ত করে আসছে।
তারা বাজার উন্মুক্ত হবার সময় বলে সরকারের নির্ধারিত ফি থেকে এক টাকা ও অতিরিক্ত নিবেন না কিন্তু বারবার তারা তাদের প্রতিশ্রতির আড়ালে হাতিয়ে নিয়েছে হাজার কোটি টাকা। তাদের কারণে অভিবাসী কর্মীরা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে মালয়েশিয়ায় যেতে বাধ্য হচ্ছে। শত শত রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসা থেকে বঞ্ছিত হচ্ছে। দেশে ভাবমর্যাদা নষ্ট হচ্ছে। মানি লন্ডারিং ও মানবপাচারের মতো জঘন্য অপরাধগুলো সংগঠিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তারা তাদের পুরানো কৌশল অবলম্বন করে বর্তমান সরকারকে ব্লাকমেইল করার চেষ্টা করছে। তারা সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করে নিলে জিরো মাইগ্রেশন কষ্টে মালয়েশিয়ান শ্রমবাজার আবার উন্মুক্ত করে দিবে। এইটা তাদের একটি সুস্পষ্ট প্রতারণা। প্রকৃতপক্ষে ইতোমধ্যে ২৫ জনকে সিন্ডিকেটের সদস্য করার কথা বলে প্রত্যেকটি এজেন্সি থেকে ১৫ কোটি টাকা দাবি করছে। অভিযোগ রয়েছে- কেউ কেউ ইতিমধ্যে টাকা পরিশোধ ও করে দিয়েছে। ২০১৬ সালে সিন্ডিকেট ফি ছিলো ৫ কোটি টাকা, ২০২১ সালে হয়েছে ৮ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা, বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ কোটিতে উপনিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদ আমলে মামলা করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি। ৫ অগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ১০০ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে থানায় এবং দুদুকে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে । আদালত থেকে সিআইডিকে মামলার তদন্ত ভার দেওয়া হলে সিআইডি কোন প্রকার তদন্ত না করে চার্জসিট না দিয়ে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে। মামলার বাদীর আপত্তির ফলে মামলাটি তদন্তের জন্য ডিবিকে আদেশ প্রদান করা হয়েছে।
বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি কোম্পানি তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘তুরাপ’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ বিনাখরচে কর্মী নিতে আগ্রহের কথা জানিয়ে লিখিত প্রস্তাব দিয়েছে মালয়েশিয়ান সরকারের কাছে। তুরাপ এর অর্থ হচ্ছে- ‘দ্য ইউনিভার্সল রিক্রুটমেন্ট আ্যডভান্সড প্ল্যাটফর্ম’। গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ফ্যাসিলিটেশন সেন্টারের (জিইএফসি) মাধ্যমে পুরো শ্রমবাজারটি পরিচালিত হবে বলেও তাদের প্রস্তাবিত ফর্মুলার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মালয়েশিয়ার জনশক্তি ব্যবসার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা জানান, বিনাখরচে মালয়েশিয়ায় কর্মী নেয়ার নতুন ফর্মুলাটি পুরনো সেই চিহ্নিত সিন্ডিকেটের প্রতারণামূলক কথা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের দাবি, এবার মালয়েশিয়ার সিন্ডিকেটের হোতা দাতো শ্রী আমিন নুর অন্য কোম্পানির নামে যে ফর্মুলায় কর্মী নেয়ার প্রস্তাব করেছে সেটিও মূলত ২০-২৫ জনের মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে কর্মী পাঠানোর ফর্মুলাই দিয়েছে।