হুসাইন বিন আফতাব, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা: “হারিকেনের মৃদু আলোয় লেখাপড়া করেছি”এমন স্মৃতি এখনও চোখে জল এনে দেয় শ্যামনগরের প্রবীণদের। বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ ঐতিহ্য ‘হারিকেন’ এখন শুধু স্মৃতির পাতায় কিংবা ঘরের পুরনো ভাঙা মাচায় মরিচাধরা কোনো বস্তু। অথচ এখান থেকে মাত্র ১৫/২০ বছর আগেও এ জনপদের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে সন্ধ্যা নামলেই ঘরে ঘরে হারিকেন জ্বালানো হতো। তখন অহরহ বিদ্যুৎ ছিল না, ছিল না আধুনিক সৌরবাতি বা চার্জলাইট আলো জ্বালানোর একমাত্র ভরসা ছিল হারিকেন।
হারিকেন মানে শুধু একটি বাতি নয়, ছিল আবেগে ভরা এক সময়ের সাহচর্য। সন্ধ্যার আগে কাচের চিমনি খুলে পরিষ্কার করা, কেরোসিন ঢেলে কাপড়ের শলাকায় আগুন ধরানো ছিল প্রতিদিনের রুটিন। কাপড়ের সেই শলাকা বাড়ানো-কমানোর মাধ্যমে আলোও নিয়ন্ত্রণ করা যেত চাকতির সাহায্যে। লোহার তৈরি ধরনিতে ধরে হারিকেন নিয়ে চলা যেত রাতের আঁধারেও—যেন অন্ধকারে এক আশার আলো।
রমযাননগরের সোরা গ্রামের ৬০ বছর বয়সী জহুরা বেগম বলেন, “আগে সন্ধ্যা নামলেই হারিকেনের কাচ ধুয়ে তেল ঢেলে আগুন দিতাম। পাটকাঠির আগুনে কখনও কখনও হারিকেন জ্বালাতে হতো।” মাস্টার রফিকুল ইসলাম বলেন, “পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত হারিকেনের আলোতেই পড়াশোনা করেছি। সে আলো কম হলেও চোখে কোনও সমস্যা হতো না।”
বর্তমানে শ্যামনগরের প্রতিটি ইউনিয়নে বিদ্যুতের সংযোগ পৌঁছে গেছে। সেইসঙ্গে এসেছে সোলার প্ল্যান্ট, চার্জার লাইট, খঊউ বাতি। হারিকেন এখন শুধুই অতীত। গ্রামীণ জনপদের দোকান গুলোতে কেরোসিন তেল আর ঠিকমত পাওয়া যায় না। দোকানদার রাশিদুল ইসলাম বলেন, “২০ বছর আগে সন্ধ্যায় কেরোসিন কিনতে লাইন লাগত। এখন কেরোসিনই আসে না। হারিকেনও নেই।” কেরোসিনের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মানুষ এখন বিদ্যুৎ নির্ভর হয়ে উঠেছে। হারিকেন ব্যবহার না করায় গ্রামের হারিকেন মেরামতের কারিগররাও আর নেই। এভাবেই প্রযুক্তির উন্নয়নে হারিকেন জায়গা করে নিচ্ছে ইতিহাসে, জাদুঘরে।
হারিকেন শুধু আলো নয়, গ্রামীণ জনপদের মানুষদের নিত্য সঙ্গী ছিল। হারিকেন জ্বালিয়ে হাটে-বাজারে কেনাকাটা, ডাকপিয়নের রাতের চিঠি বিলি, কিংবা উঠানে বসে একসাথে পড়াশোনা—এইসব দৃশ্য একসময় ছিল শ্যামনগরের নিত্যদিনের চিত্র। বিশেষ করে অমাবস্যার রাতে পথ চলা হতো হারিকেন হাতে। নাজির সরদার নামের ৭০ বছরের এক বৃদ্ধ বলেন, “আমাদের সময় লেখাপড়ার জন্য একমাত্র ভরসা ছিল হারিকেন। এখন এলাকায় বিদ্যুতের প্রভাবে হারিকেন নেই বললেই চলে।” তিনি আরও জানান, তাদের বাড়িতে ‘তাজ হারিকেন’ নামে একটি হারিকেন এখনও পড়ে আছে, তবে ব্যবহৃত হয় না। শুধু শ্যামনগর নয়, পুরো গ্রামবাংলাতেই আজ হারিকেন শুধুই স্মৃতি। জাপানি শব্দ হলেও হারিকেন বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল বহুদিন ধরে। আজ তা মুছে যাচ্ছে আধুনিকতার ছোঁয়ায়।
তাপবিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং আধুনিক চার্জলাইটের ছোঁয়ায় হারিকেন আজ অপ্রয়োজনীয়। নতুন প্রজন্ম জানেও না হারিকেন কী বা কীভাবে এটি ব্যবহার করা হতো। তাই অনেক প্রবীণই বলছেন, হয়তো একদিন হারিকেন দেখার জন্য যেতে হবে জাদুঘরে। শ্যামনগরের মানুষ বলছে—হারিকেনের আলো আজ শুধুই বিস্মৃত স্মৃতি, অথচ এ আলোয় একদিন আলোকিত হতো গোটা গ্রাম।
প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, অতীতের সেই মৃদু আলো, ঘরের উঠোনে একসাথে বসে পাঠ করার মুহূর্ত আর ডাকপিয়নের হারিকেন হাতে চিঠি বিলি—এই সব স্মৃতি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। বিলুপ্তপ্রায় হারিকেন শুধু এক বাতি নয়, এক যুগের প্রতীক, যা আজ ইতিহাসে জায়গা করে নিচ্ছে নিঃশব্দে।