বাহুবল (হবিগঞ্জ) সংবাদদাতা : হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, চিকিৎসক সংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নি¤œমানের খাবার সরবরাহের কারণে রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। স্থানীয়দের দাবি, এসব সমস্যার কারণে সরকারি হাসপাতালের প্রতি মানুষের আস্থা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ১৯৮৪ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে চালু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি ২০১১ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামো ও আধুনিক সরঞ্জাম নিশ্চিত না হওয়ায় সেবার মান বাড়েনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সার্জারি যন্ত্রপাতির ঘাটতি, ওয়ার্ডে পানি-বিদ্যুৎ সমস্যার পাশাপাশি বাথরুমে দুর্গন্ধ, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং প্যাথলজি বিভাগের সীমাবদ্ধতায় চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের বাইরে পাঠানো হচ্ছে, ফলে বাড়ছে অতিরিক্ত ব্যয়।
চিকিৎসা নিতে আসা জাহানারা খাতুন বলেন, “জরুরি বিভাগে ডাক্তার পরীক্ষা করতে বলেছেন, কিন্তু হাসপাতালে তা হয়নি। বাইরে গিয়ে করাতে হয়েছে—এটাই কি সরকারি চিকিৎসা ?”
স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত এমবিবিএস চিকিৎসক না থাকায় সবসময়ই ম্যাটস (মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল) ইন্টার্নদের দিয়ে রোগী দেখা ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অভিজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়াই কিছু ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশন দেওয়া বা রোগ নির্ণয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাদের। এতে ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন রোগী ও স্বজনরা।
এক রোগীর স্বজন বলেন, ডাক্তার পাইনি, একজন প্রশিক্ষণরত স্টাফ দেখে ওষুধ লিখে দিয়েছেন। আমরা বুঝতেই পারিনি তিনি পূর্ণাঙ্গ ডাক্তার নন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশিক্ষণার্থীদের দিয়ে চিকিৎসা করানো আইনগত ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ, যদি তা যথাযথ তত্ত্বাবধান ছাড়া করা হয়।
কেবিন, ওষুধ, খাবার নিয়েও অভিযোগ রয়েছে রোগী ও স্বজনদের , হাসপাতালের কেবিনগুলো প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং প্রভাব খাটাতে পারলে তবেই কেবিন পাওয়া যায়। ভর্তি রোগীদের জন্য সরকারি খরচে খাবার সরবরাহের কথা থাকলেও তা মানসম্মত নয়। একইভাবে বিনামূল্যের ওষুধও পর্যাপ্ত দেওয়া হয় না; গজ, ব্যান্ডেজ, তুলার মতো মৌলিক সামগ্রীও বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যন্ত্রপাতি ও ওষুধ কেনায় অনিয়ম, বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দাম দেখানো এবং নি¤œমানের সরঞ্জাম সরবরাহের ঘটনা নিয়মিত। নিয়োগ ও বদলিতে প্রভাব-বাণিজ্য এবং কর্মস্থলে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অভিযোগ আছে, অফিস সময়েও কিছু চিকিৎসক ব্যক্তিগত চেম্বারে ব্যস্ত থাকেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দ্রুত সংস্কার, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ, দালাল চক্র নির্মূল এবং কঠোর তদারকি ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারিও জরুরি বলে তারা মনে করেন।
এ বিষয়ে জানতে বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল্লাহ হেল মারুফ ফারকী-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়-এটি জনস্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর সরাসরি আঘাত। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপই পারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।