মুঃ শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : শহরের কোলাহল, কৃত্রিম স্বাদ আর ঝাঁজ চকচকে প্যাকেটের ভিড়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎ যদি চোখে পড়ে এক থালা সাদা ঝরঝরে মুড়ি আর তার ওপর রাখা একটি গোলাকার এক টুকরো আটারনাড়ু তাহলে মন মুহূর্তেই ছুটে যায় শেকড়ে, শৈশবের উঠানে, শীতের রোদ মাখা বিকেলে। এই সামান্য খাবারটিই যেন গ্রামবাংলার হাজারো গল্পের নীরব সাক্ষী। মুড়ি আর এক টুকরো আটারনাড়ু বাংলার জনজীবনে কোনো বিলাস নয়, বরং আত্মপরিচয়ের অংশ। কৃষকের মাঠে কাজের ফাঁকে, রাখালের গাছতলায় বিশ্রামে, কিংবা শীতের সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে- মুড়ি ও এক টুকরো আটারনাড়ু ছিল শক্তি আর তৃপ্তির সহজ সমাধান। ছবির এই থালাটি শুধু খাবার নয়, এটি একটি সময়, একটি সংস্কৃতি, একটি জীবনচর্চার প্রতিচ্ছবি।
গ্রামবাংলায় একসময় ঘরে ঘরে মুড়ি ভাজা হতো। নতুন ধান ঘরে উঠলেই চুলায় বসত হাঁড়ি, নারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন মুড়ি ভাজায়। আর শীত এলেই খেজুর গাছ থেকে নামত রস, সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হতো গুড়, মাটির হাঁড়িতে রাখা সেই গুড় ছিল ঘরের অমূল্য সম্পদ। মুড়ির সঙ্গে গুড়ের এই যুগলবন্দি তাই কেবল স্বাদের নয়, পরিশ্রম আর প্রকৃতির মিলনের ফল এক টুকরো আটারনাড়ু।
শিশুদের কাছে এটি ছিল উৎসব। এক টুকরো আটারনাড়ুর ছোট্ট বল ভেঙে মুড়ির সঙ্গে মিশিয়ে নেওয়ার আনন্দ আজকের চকলেট বা ফাস্টফুডেও মেলে না। এক মুঠো মুড়ি মুখে দিলেই এক টুকরো আটারনাড়ু মিষ্টতা আর মুড়ির খসখসে স্বাদ মিলেমিশে তৈরি করত এক অনন্য অনুভূতি, যা আজও বহু মানুষের স্মৃতিতে অমলিন।
কালের বিবর্তনে খাবারের তালিকা বদলেছে। শহরে মুড়ি এখন ফুচকা, চটপটি কিংবা ব্র্যান্ডে, স্ন্যাকসের সঙ্গী। কিন্তু খাঁটি মুড়ি আর গুড়ের সেই এক টুকরো আটারনাড়ু নির্ভেজাল সম্পর্ক ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও গ্রামের কোনো উঠানে, কোনো সাধারণ ঘরের টেবিলে আজও মাঝে মাঝে দেখা মেলে এই দৃশ্য- এক থালা মুড়ি, তার ওপরে রাখা এক টুকরো আটারনাড়ুর বল।
এই ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের দৌড়ে আমরা যতই এগিয়ে যাই না কেন, শিকড়ের স্বাদ ভুলে গেলে চলবে না। কারণ এই সাধারণ খাবারগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর আত্মার আরাম।
এক থালা মুড়ি আর এক টুকরো আটারনাড়ু দেখতে খুব সাধারণ। কিন্তু এর ভেতরেই আছে গ্রামবাংলার অসাধারণ গল্প।