খুলনার কয়েকটি নদী ও খাল থেকে গত ১ বছরে ৪৮ টি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে ৩০ টি শনাক্ত এবং বাকী গুলো অশনাক্ত রয়েছে। লাশ উদ্ধার ঘটনায় ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন থানায় ১৪ টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নদী থেকে একের পর এক লাশ উদ্ধারের ঘটনায় নগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল বেশ।

সর্বশেষ ৯ জানুয়ারি (শুক্রবার) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে খুলনা মহানগরীর ৬ নম্বর ঘাট এলাকা থেকে সুকর্ণী মিলন ঘোষের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এমভি তাওছীফ আয়মান-২ ও এমভি ক্রাউন-৩ লাইটার ভেসেলের মাঝখানে ভাসমান অবস্থায় লাশটি দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে তারা পুলিশকে খবর দেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এমভি তাওছীফের সুকর্ণী মিলন ঘোষ নদী থেকে পানি তোলার জন্য দুইটি লাইটার ভেসেলের মাঝখানে যান। এ সময় তিনি ভাসমান অবস্থায় লাশটি দেখতে পান। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে খুলনা থানায় খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নৌ-পুলিশকে অবহিত করে। খবর পাওয়ার প্রায় দুই ঘণ্টা পর নৌ-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে।

নৌ-পুলিশ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ বাবুল আক্তার জানান, খবর পেয়ে সত্যতা নিশ্চিত করার পর জরুরি টিম ঘটনাস্থলে যায় এবং লাশ উদ্ধার করে। লাশটির মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত খুলনার বিভিন্ন নদী ও খাল থেকে ৪৮ টি ভাসমান লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরমধ্যে ৮ জন নারী, ৩৩ জন পুরুষ এবং ৭টি শিশুর লাশ রয়েছে। এদের মধ্যে ৩০ টি শনাক্ত করা গেলেও বাকী ১৮টি লাশের টিস্যু পচে যাওয়ার কারণে তাদেরকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ি জানুয়ারি মাসে ১ টি ফেব্রুয়ারি মাসে ২টি, মার্চ মাসে ৪টি, এপিল মাসে ৩টি, মে মাসে ৬টি , জুন মাসে ৬ টি, জুলাই মাসে ৩টি, আগষ্ট মাসে ৮টি সেপ্টেম্বরে ৬টি, অক্টোবরে ৩টি, নভেম্বরে ৪টি এবং ডিসেম্বারে ২টি লাশ উদ্ধার করা হয় খুলনার বিভিন্ন নদী ও খাল থেকে।

জানতে চাইলে নৌ পুলিশ সুপার ডা. মুহাম্মদ মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা ও পিরোজপুর নিয়ে নৌ পুলিশ খুলনা অঞ্চল গঠিত। নদী থেকে আমরা তিন ধরণের লাশ পাই। হত্যাকান্ড, আত্মহত্যা এবং সাধারণ মৃত্যু। সাধারণ মৃত্যুর লাশগুলো জিডি মুলে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় ১৪টি মার্ডার মামলা এবং অপমৃত্যু ২৬টি এবং মামলা ছাড়া ৮ টি লাশ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছি। ১৪ টি হত্যা মামলায় ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গ্রেফতারের সংখ্যা কম কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, লাশকে প্রথমে শনাক্ত হতে হবে। তাহলে বুঝতে পারি কে বা কোন ব্যক্তি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। না চিনতে পারলে আর কোন সুযোগ থাকেনা। তাছাড়া এখানকার পানি নোনা, ড্যাম ও বৃষ্টিতে লাশগুলে দ্রুত পচে যায়। ৩ দিনের বেশী হলে টিস্যুগুলো পচে তার পরিচয় শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে হয়ে পড়ে। জোয়ার ভাটায় বিভিন্ন এলাকা থেকে লাশগুলো ভেসে আসে। সেক্ষেত্রে আমরা সারা দেশে খবর পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এর ফলাফল ভাল আসেনা।

এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ১-২ দিনের নবজাতক বাচ্চা লাশ পাওয়া যায়। পুলিশের মধ্যে একটি চর্চা আছে যে এগুলোকে তারা হত্যা মামলা হিসেবে দেখত না। শিশু তো ঘটনাস্থলে হেটে আসেনি। তাকে কেউ না কেউ ফেলে যায়। তাই শিশুদের লাশগুলো শনাক্ত করা যায়না। এগুলো আমরা মার্ডার মামলা হিসেবে নেই। মানুষ শনাক্ত হয়না আর শিশু শনাক্ত হবে কি করে। এ মামলা গুলোর বাস্তব সমাধান হয়না। আমরা মার্ডার মামলা নেই। এ মামলা গুলোর আাসমি গ্রেফতার করা সম্ভব হয়না। তিনি আরও বলেন, লাশ দেখে যদি সন্দেহ হয় তাহলে হত্যা মামলা করি রিপোর্ট যদি নেগেটিভ হয় তাহলে অপমৃত্যু। এরকম দুইটি পেয়েছি। সন্দেহ হলে আমরা তা উচু ধাপে নিয়ে যাই। তাছাড়া আমরা যতগুলো লাশ পেয়েছি ততগুলোর ঘটনাস্থল নদী নয়। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। সকল ঘটনার ঘটনাস্থল স্থলভাগ এবং নৌপুলিশ নদী কেন্দ্রিক যে তথ্য ভান্ডার সেটি আমাদের কাছে কম বেশি আছে। কিন্তু স্থল কেন্দ্রিক কোন কোন হত্যাকান্ড ঘটেছে সেখানকার চক্রগুলি যদি পেশাদার অপরাধী বা সংঘবদ্ধ অপরাধী হয়ে থাকে তাহলে তাদের ব্যাপারে আমাদের তথ্য কম। তখন এই ঘটনার ফলে কোন হত্যাকান্ড ঘটে থাকে সেটির তদন্ত করতে গিয়ে আমাদের যথেষ্ঠ বেগ পেতে হয়। যেহেতু স্থলভাগ আমাদের অধিক্ষেত্র নয়। তবুও এক্ষেত্রে আমরা স্থানীয় পুলিশ, র‌্যাব এবং পিবিআইয়ের সহযোগীতা নিয়ে থাকি। একটি স্থান থেকে অন্য স্থানে গেলে তদন্তে সময় লাগে। তাছাড়া আমাদের লোকবল কম। থানা ফাড়িতে কম লোক দিয়ে কাজ করছি। নদী কেন্দ্রিক নিরাপত্তার জন্য টহল পেট্রল সব সময় লাগে এটি নিশ্চিত করে তদন্ত করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। লোকবল বেশি হলে ঠিকমতো কাজ করা সম্ভব হত বলে জানান এই কর্মকর্তা।