গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া ও ঘাগটিয়া ইউনিয়নের উপর দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত ঐতিহাসিক ঘোরশ্বাব জলমহালকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধ ও ক্ষোভ আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। লীজের নামে সমঝোতার মাধ্যমে জলমহালটি দখলে রেখে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত করার অভিযোগ তুলে এটি সকলের জন্য উন্মুক্ত করার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে এলাকাবাসী।
স্থানীয়ভাবে ঘোরশ্বাব নদী হিসেবেও পরিচিত এই জলমহাল প্রায় ১২১ একর আয়তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত জলাশয়, যা দীর্ঘদিন ধরে এলাকার প্রধান মৎস্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের মতে, একসময় পাশের শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র ও বানার নদীর সঙ্গে এই জলাশয়ের স্বাভাবিক সংযোগ ছিল। ফলে এখানকার মাছের স্বাদ ও প্রাচুর্যের জন্য ঘোরশ্বাব জলমহালের সুনাম দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
এলাকার প্রায় ৫ থেকে ৬টি গ্রামের প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষের জীবিকা এই জলমহালকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায় এখানে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। পাশাপাশি কৃষি জমির সেচ ব্যবস্থা ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গেও জলমহালটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় প্রভাবশালী মহলের নজরে পড়ে এই জলাশয়। ইজারা ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে উন্মুক্ত চরিত্র হারিয়ে ফেলে এবং স্থানীয় জেলে ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনধারণ কঠিন হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, ১৯৯৫ সালে সরকারি গেজেট অনুযায়ী ২০ একরের বেশি আয়তনের জলমহালকে উন্মুক্ত জলাশয় হিসেবে ঘোষণার নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। সেই হিসাবে ঘোরশ্বাব জলমহালও উন্মুক্ত জলাশয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। অতীতে এখানে সরকারিভাবে নিয়মিত মাছের পোনা অবমুক্ত করা হতো এবং স্থানীয় জেলেসহ সাধারণ মানুষ তার সুফল ভোগ করতেন।
তবে পরবর্তীতে গাজীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জলমহালের একটি অংশ লীজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৫ সালে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রায় ১২ লাখ ২৮ হাজার ৯৬০ টাকায় তিন বছরের জন্য একটি মৎস্য সমবায় সমিতির নামে জলমহালটির ৫০ একর অংশ ইজারা দেওয়া হয়। ওই সময় থেকেই জলমহালটির উন্মুক্ত ব্যবস্থাপনা কার্যত বন্ধ হয়ে যায় বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রায় ১২১ একর আয়তনের জলমহালের মধ্যে মাত্র ৫০ একর কীভাবে লীজ দেওয়া হলো এবং সেই অংশের সুনির্দিষ্ট তফসিল ও চৌহদ্দি নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না-এ নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। বাস্তবে লীজ দেওয়ার পর পুরো জলমহালই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং কোনো জেলে সেখানে মাছ ধরতে নামলে তাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।