• বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ফুয়েল লোডিং আগামী মাসে
  • ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হবে মার্চে

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। গতকাল রোববার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ডলারের হিসেবে খুব বেশি ব্যয় বাড়েনি। কিন্তু টাকার অঙ্কে দেখলে অনেক বেশি বৃদ্ধি মনে হয়।

ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় বাড়ছে সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাব এটা।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানান, একনেক সভায় ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২টা একনেক হওয়ার কথা ছিল। সেটি না করে ১টা করায় প্রকল্প বেশি হয়েছে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকার খুব বেশি নতুন প্রকল্প নেয়নি বলে জানান ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। সেইসঙ্গে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, ২০১৩ সালের অক্টোবরে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। ২০২১ সালের শুরুতে একটি ইউনিট উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও মহামারির জটিলতায় তা পিছিয়ে যায়। পরে ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা জটিলতায় প্রকল্পের কাজ আরও বিলম্বিত হয়। সংশোধিত অনুমোদনের ফলে এর শেষ হওয়ার সময় ধরা হয়েছে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।

এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আগামী ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ ফুয়েল লোডিং করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট রোসাটমের প্রকৌশলীরা। গত ১৬ জানুয়ারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। এসময় তিনি প্রকল্পের অগ্রগতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প বাংলাদেশ সরকারের একটি মেগা প্রকল্প, যা রূপপুরে অবস্থিত এবং নির্মাণকাজ সব আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট রোসাটমের প্রকৌশলীরা জানান, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ নাগাদ ইউনিট-১ এ ফুয়েল লোডিং করা সম্ভব হবে।

আরও জানানো হয়, মার্চের শেষ দিকে ইউনিট-১ হতে প্রায় ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে প্রকল্পটির মাধ্যমে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ইউনিট-১ হতে কার্যকরভাবে প্রায় ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

সূত্রমতে মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে সেটি ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি ৮৫ লাখ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ ২২ দশমিক ৬৩ শতাংশ খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ব্যয় বৃদ্ধির পুরো অর্থই মিলবে প্রকল্প ঋণ থেকে।

এদিকে, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ একনেকে অনুমোদন পাওয়া ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ১০ হাজার ৮৮১ কোটি ৪০ লাখ, বৈদেশিক ঋণের ৩২ হাজার ৯৮ কোটি এবং সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।

ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় পুনর্র্নিধারণ করা হলেও এতে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) খাতে প্রায় ১৬৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বাস্তবায়নাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। সেসময় প্রকল্পটির মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ধরা হয় ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের বাস্তবতা বিবেচনায় প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন তথ্য কর্মকর্তা সৈকত আহমেদ বলেন, বর্তমানে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের কাজ চলমান রয়েছে।

সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। যদিও সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- জিওবি খাতে ব্যয় ১৬৬ কোটি টাকা কমেছে। ফলে জাতীয় বাজেটের ওপর সরকারের সরাসরি চাপ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।

প্রকল্প অনুমোদনের সময় প্রতি মার্কিন ডলার ৮০ টাকা ধরে ব্যয় হিসাব করা হয়েছিল। কিন্তু গত নয় বছরে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে প্রায় ১২২.৪০ টাকা হওয়ায় বৈদেশিক ঋণের অংশ টাকায় রূপান্তরিত হয়ে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বাস্তবতায় সংশোধিত ডিপিপিতে বিভিন্ন খাতে ব্যয় পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।

সংশোধিত প্রস্তাবে ৩৪টি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং ৪৯টি খাতে বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে। জনবল ব্যয়, ভূমি অধিগ্রহণ ক্ষতিপূরণ, বিদ্যুৎ বিল ও পরামর্শক খাতে সাশ্রয়ের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থ সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি, প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত প্রয়োজন মেটাতে ১০টি নতুন খাত সংযোজন করা হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা নিশ্চিত করতে অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত সেবা চুক্তি এবং খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ চুক্তির বিষয়েও আলোচনা চলমান রয়েছে। এছাড়া আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি জনবলের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে গ্রিনসিটি আবাসিক এলাকার অসমাপ্ত ভবন সম্পন্ন এবং নতুন অধিগ্রহণকৃত প্রায় ৬.০৬ একর জমিতে প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনাও সংশোধিত প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।