আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনেই বইছে নির্বাচনী হাওয়া। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই নগর থেকে শুরু করে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রার্থীরা চষে বেড়াচ্ছেন ভোটের মাঠ। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের সরব উপস্থিতিতে নির্বাচনী প্রচারণা এখন তুঙ্গে।

চট্টগ্রামের নির্বাচনী সমীকরণে এবার বিএনপি ও ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে বিএনপি চট্টগ্রামের ১৬টি আসনেই এককভাবে প্রার্থী দিয়েছে দলটি। জামায়াতে ইসলামী ১০ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের ১৩ জন প্রার্থী চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জোটের হয়ে চট্টগ্রাম-৫ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, চট্টগ্রাম-১১ আসনে এনসিপি এবং চট্টগ্রাম-১৪ আসনে লড়ছেন এলডিপি-র প্রার্থীরা।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে মোট ১১১ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ফ্রন্ট ও ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি ও খেলাফত মজলিস, এনসিপি এবং অন্যান্য স্বতন্ত্র প্রার্থী। ২৫টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এবার এই অঞ্চলে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।

ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা বিভিন্ন কৌশলে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে গণসংযোগ ও পথসভা, পাড়া-মহল্লায় উঠান বৈঠক ও পথসভার মাধ্যমে ভোটারদের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছেন প্রার্থীরা। বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা দলীয় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে দুইটি আসনে বিএনপির দুইজন বিদ্রোহী প্রার্থী ধানের শীষের প্রার্থীর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিদ্রোহী প্রার্থীরা ভোটের মাঠে মূল দলের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেন এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে আরও বহুমাত্রিক করে তুলতে পারেন।

ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই চট্টগ্রামের অলিগলিতে উত্তেজনা বাড়ছে। ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রার্থীরা তাদের শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় জয়লাভের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

চট্টগ্রাম-১০ আসনের ২৬ নম্বর উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডে শুক্রবার সকালে গণসংযোগ ও প্রচারণা চালান অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী। এ সময় তিনি জুলাই যোদ্ধাসহ সকল শহীদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের বিজয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি এলাকার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন। গণসংযোগে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সমর্থন লক্ষ্য করা যায়।

চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১০ দল সমর্থিত সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচারণা চালান। তিনি নির্বাচিত হলে মিথ্যা আশ্বাস নয়, ইনসাফ ও ন্যায়ভিত্তিক বাস্তব উন্নয়নের অঙ্গীকার করেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে গণসংযোগে ব্যাপক জনসমর্থন পাওয়া যায়।

চট্টগ্রাম ১৩ আসনে নতুন বাংলাদেশ গড়তে ও চাঁদাবাজমুক্ত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আগামী ১২ তারিখ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া জরুরি। সভায় জামায়াত নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম ১ আসনে চাঁদার টাকার চেয়ে ভিক্ষা করে নির্বাচন করাই ভালো বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াত প্রার্থী এডভোকেট ছাইফুর রহমান। শনিবার মিরসরাইয়ের মিঠাছরা শাপলা কমিউনিটি সেন্টারে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, চাঁদাবাজির টাকা ছাড়া স্বচ্ছ ও আধুনিক নির্বাচনি নীতিতেই তিনি নির্বাচন করতে চান। জামায়াত আয়োজিত এ সভায় দলটির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম ১১ আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শনিবার চট্টগ্রাম নগরীর দক্ষিণ হালিশহরে গণসংযোগ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১০ দল সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ শফিউল আলম। তিনি মাদ্রাজীশাহ পাড়া, নেভী হাসপাতাল গেইট, কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতির অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। গণসংযোগে সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়।

চট্টগ্রাম ১১ আসনে বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামের ২৮ নম্বর দক্ষিণ পাঠানটুলি ওয়ার্ডে গণসংযোগকালে বলেন, বিএনপি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রধান শক্তি এবং কখনো আপোসের রাজনীতি করেনি। তিনি দাবি করেন, দেশজুড়ে ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে এবং বিএনপিই জনগণের সবচেয়ে আস্থার রাজনৈতিক দল। এ সময় তিনি পলোগ্রাউন্ডে তারেক রহমানের জনসভা হবে সর্বসাধারণের মহাসমাবেশ বলে মন্তব্য করেন। গণসংযোগে মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম ৮ আসনে জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ মো. ওমর বিন নুরুল আবছারের কবর জিয়ারত করে চট্টগ্রামে ভোটের প্রচার শুরু করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী জোবাইরুল আরিফ। বৃহস্পতিবার বোয়ালখালীর আকুবদ-ী এলাকায় কবর জিয়ারতের পর তিনি গণসংযোগ করেন। চট্টগ্রাম-৮ আসনে শাপলা কলি প্রতীকে প্রার্থী জোবাইরুল আরিফ জুলাই আন্দোলনের চেতনা রক্ষা ও নব্য স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন।