নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন দফতরের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এবার দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করলেন। দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও হাফিজ আহসান ফরিদ গতকাল মঙ্গলবার বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর তাদের পদত্যাগের বিষয়টি জানানো হয়। প্রায় ১৫ মাস দায়িত্ব পালনের পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১৪তম দিনে তারা পদত্যাগ করলেন।

পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর আলি আকবার আজিজী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। গত ১৫ মাস কাজ করেছি। আমাদের কাজের মূল্যায়ন আপনারাই করবেন। তবে বলতে পারি, আগের কমিশনগুলোর তুলনায় আমরা বেশি কাজ করেছি।

চেয়ারম্যান মোমেন ও তার কমিশন এদিন সকালেও সেগুনবাগিচায় কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে দাপ্তরিক কাজ করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গতকাল বেলা আড়াইটার পরপর দুদকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেনকে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দিকে যেতে দেখা যায়। এ সময় তার হাতে একটি কাগজ ছিল। একই সময়ে দুদকের কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজীও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দিকে যান। অল্প কিছুক্ষণ পর বেলা পৌনে তিনটার দিকে তারা বেরিয়ে আসেন। গাড়িতে ওঠার সময় আবদুল মোমেনের কাছে তার পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তবে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। পরে আলি আকবার আজিজীর কাছে জানতে চাইলে তিনি তিনজনের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আলি আকবার আজিজী তাকে বহনকারী গাড়ি থেকে দুদকের পতাকা নামানো দেখিয়ে বলেন, এই যে আমি ফ্ল্যাগ ডাউন করে দিয়েছি।

চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তনের হাওয়ায় দুদকের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর মোহাম্মদ আবদুল মোমেনকে দুদকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়। তার আগ পর্যন্ত তিনি চুক্তিতে সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার দুদিন আগে ১০ ডিসেম্বর অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদকে কমিশনারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আলি আকবার আজিজী ১১ ডিসেম্বর এবং হাফিজ আহসান ফরিদ ১৫ ডিসেম্বর দায়িত্ব নেন।

কেন পদত্যাগ, ব্যাখ্যা দিলেন দুদকের মোমেন কমিশন

দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং তার কমিশনের দুই সদস্য একযোগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে সাড়ে ৩টার দিকে সেগুনবাগিচায় দুদক কার্যালয়ে ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান। এসময় কমিশনের অপর দুই সদস্যও উপস্থিত ছিলেন।

মোমেন বলেন, আমরা তিনজন, এই কমিশনের তিন সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছি। পদত্যাগপত্র মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পদত্যাগের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের পদত্যাগের বিশেষ কোনো কারণ নেই। একটি নতুন সরকার এসেছে, সেই সরকারেরও প্রত্যাশা রয়েছে। সরকার তার সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য নিশ্চয় আমাদের চেয়ে অধিকতর যোগ্য কমিশন গঠন করবেন।

নিজেদের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আবদুল মোমেন বলেন, আমরা ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর দায়িত্ব নিই। কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ১১ ডিসেম্বর এবং কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত হাফিজ আহসান ফরিদ ১৫ ডিসেম্বর যোগ দেন। এই সময়টুকু আমরা আমাদের সাধ্যমত দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। আমাদের কাজের বিচার আপনারাই করবেন।

এক প্রশ্নের উত্তরে মোমেন বলেন, আমাদের এতদিন নখদাঁত ছিল কি ছিল না, সেটার বিচার করার মালিক আপনারা। আমরা যে সময় দায়িত্বে ছিলাম, সে সময় দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি।

পদত্যাগে কোনো রাজনৈতিক বার্তা যাচ্ছে কি না-সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, একটা নতুন সরকার এসেছে, তাদের ম্যানিফেস্টো আছে, প্রত্যাশা আছে। সরকার তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করবে। সেখানে ভিন্ন কিছু দেখছি না। তিনি বলেছেন, নতুন সরকারের নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথটি সুগম করতেই এই পদক্ষেপ। তারা অনুভব করেছেন,এখন তাদের চেয়ে অধিকতর যোগ্য ব্যক্তিদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এতে কমিশন যেমন উপকৃত হবে, তেমনি রাষ্ট্রেরও উপকার হবে।

বিধিবদ্ধ এ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পাওয়ার পর তা পালনে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন দাবি করে আবদুল মোমেন বলেন, যার সাক্ষী আপনারাই। নিজেদের কাজের মূল্যায়নের ভার জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়ে তিনি বলেন, তারা কতা সফল হয়েছেন, তা জনগণই ভালোভাবে বিচার করতে পারবে।

গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়ার কথা জানিয়ে আবদুল মোমেন বলেন, আপনারা আমাদের সহযোগিতা করেছেন, এ জন্য আমরা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।