সুন্দরবনে হরিণ শিকার বন্ধে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালিত হলেও অবৈধ শিকার কার্যক্রম পুরোপুরি থামছে না। বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ফাঁদ উদ্ধার হলেও শিকারী চক্রের অনেক সদস্য এখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সুন্দরবন বিভাগ জানিয়েছে, গত বছরের মে মাস থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে পূর্ব সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে বনরক্ষীরা মোট প্রায় ৭৫ হাজার ফুট হরিণ ধরার ফাঁদ উদ্ধার করেন। পাশাপাশি জব্দ করা হয়েছে প্রায় ২৪২ কেজি হরিণের মাংস। এছাড়া বনজ সম্পদ আহরণে ব্যবহৃত ৩৫২টি ট্রলার ও নৌকা, ৮১৬ কেজি কাঁকড়া, কাঁকড়া ধরার প্রায় ৫ হাজার চারু, ২৩১টি মাছ ধরার জাল এবং ২২ বস্তা শুকনো মাছও উদ্ধার করা হয়।
এইসব অভিযানে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অভিযোগে মোট ৩১৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা দায়ের করে বাগেরহাট জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সুন্দরবন একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী বনাঞ্চল এবং এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হরিণের উপস্থিতি রয়েছে। এই হরিণই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান খাদ্য। তাই হরিণের সংখ্যা কমে গেলে বাঘের অস্তিত্বও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তিনি বলেন, বন বিভাগের অভিযানে বিভিন্ন এলাকায় কয়েক কিলোমিটারজুড়ে পাতা অসংখ্য ফাঁদ অপসারণ করা হয়েছে। এসব ফাঁদ সময়মতো উদ্ধার করা না হলে বিপুল সংখ্যক বন্যপ্রাণী মারা যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
তবে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পরও শিকারী চক্রের মূল সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রেই ধরা না পড়ায় বন বিভাগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশবাদীরা। তাদের মতে, সুন্দরবনে অবৈধভাবে হরিণ শিকার অব্যাহত থাকলে বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বনসংলগ্ন কিছু বাজার এলাকায় গোপনে হরিণের মাংস বিক্রি হয় এবং বিশেষ করে ঈদের সময় এসব মাংস ব্যবহার করে উৎসব উদযাপনের ঘটনাও ঘটে।
পরিবেশবিদরা আরও বলেন, হরিণের সংখ্যা কমে গেলে সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। কারণ হরিণ বাঘের প্রধান খাদ্য। এর ফলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই বন অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি বনসংলগ্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক যেকোনো ধরনের বন অপরাধ দমনে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, এই বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় অবৈধ কার্যক্রম কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
তিনি আরও জানান, বন বিভাগ বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছে। লিফলেট বিতরণ, মাইকিং এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি সুন্দরবনে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা চালু করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে পাতা ফাঁদে শুধু হরিণ নয়, অনেক সময় বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীও আটকা পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বনসংলগ্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।