দারিদ্র্যতা ও অর্থ সংকট দমিয়ে রাখতে পারেনি ফেরিওয়ালার সন্তান সাকিব খানকে। জেএসসি.এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সে। এরপরেও অভাব নামক এক অদৃশ্য দানব তার আগামী দিনের লালিত স্বপ্নকে অক্টোপাশের মতো আঁকড়ে ধরেছে। তবুও সে উচ্চশিক্ষা নেয়ার আকাক্সক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে বিত্তবানদের সহযোগিতা চেয়েছে।

নীলফামারীর সদর উপজেলার কুন্দপুকুর ইউনিয়নের শালহাটি গ্রামের ফেরি করে কাপড় বিক্রী করা মহসীন আলীর তিন ছেলের মধ্যে সবার বড় সাকিব খান। বসতভিটা ছাড়া আর কোন জমি নেই তাদের। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামে গ্রামে সাইকেলে করে কাপড় নিয়ে বিক্রী করে মহসিন। এরপরেও সব সময় সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকত। একার রোজগারে ৫ সদস্যের সংসার ঠিকমতো চলত না, সেখানে ছেলেদের লেখা-পড়ার খরচ যোগাবে কোথায় থেকে। ফলে জিপিএ-৫ নিয়ে পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর লেখা-পড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় সাকিবের। কিন্তু ছেলের মেধা ও প্রবল ইচ্ছা শক্তির কাছে সকল প্রতিবন্ধকতা হার মানে। এলাকাবাসি ও শিক্ষকদের সাহায্য-সহযোগিতায় নীলফামারী সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে মেধার স্বাক্ষর রাখেন সাকিব। এরপর নীলফফামারী সরকারি কলেজ থেকে ২০২৪ সালের এইচএস সি পরীক্ষায় দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে মানবিক বিভাগে ৬ষ্ট স্থান অধিকার করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ সেশনে ভর্তি পরীক্ষায় কলা,আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়ে আবারও তার মেধা ও ইচ্ছা শক্তির প্রমান দেয় সাকিব । এই শাখায় তার মেধাক্রম ১১১৩। অর্থাভাবে ভর্তির পরীক্ষার কোর্চি করতে না পারলেও মেধা আর অদম্য ইচ্ছা শক্তিই তাকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে।

সাকিবের ইচ্ছা সে প্রশাসনিক বড় কর্মকর্তা হয়ে মানুষের সেবা করতে চায়। এজন্য ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা অব্যাহত রাখতে চায়। কিন্তু দরিদ্র পিতা পারবে কি তার সে সাধ পুরণ করতে? পারবে কি তার পড়াশুনার খরচ চালিয়ে যেতে। এরকম নানা শঙ্কা এখন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সাকিবকে।

ছেলের সাফল্যে আনন্দের মধ্যেও কষ্ট তাড়া করে সাকিবের মা কমলা বেগমকে। ছেলের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে বলেন, অনেক সময়ই না খেয়ে স্কুল-কলেজে যেতে হয়েছে ছেলেকে। তার পরও থেমে থাকেনি তার মেধা। সে শুধু একটাই বলেছে “মা যত কষ্টই হউক আমাকে বড় হতে হবে।”

পিতা মহসিন আলী জানান, ফেরি করে কাপড় বিক্রী করা তার একমাত্র পেশা। কোন কারণে গ্রামে যেতে না পারলে সে দিন তাদের না খেয়ে থাকতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন তার চিন্তার শেষ নেই। তিনি বলেন ছেলের ভর্তি, সেখানে থাকা-খাওয়া ও আনুষাঙ্গিক খরচ কিভাবে যোগাবো এ চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না। ছেলের উচ্চ শিক্ষা অর্জনে সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চান তিনি।

নীলফামারী সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ মাহাবুবুর রহমান ভূঁইয়া জানান, সাকিবের মেধার কাছে হার মেনেছে সকল বাধা। অদম্য এ মেধাবীর উচ্চ শিক্ষা গ্রহনে সহযোগীতায় দেশের হৃদয়বান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আবহ্বান জানান তিনি।