শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ): বাংলার গ্রামীণ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ‘ঢ্যারা’। একসময় দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ ঘরে দেখা যেত এই ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত যন্ত্রটি। তুলা, সুতলি কিংবা পাট থেকে সুতা কাটা ও মোড়ানোর কাজে ঢ্যারা ছিল গ্রামীণ নারীদের নিত্যসঙ্গী। আজ প্রযুক্তির যুগে এসে সেই ঢ্যারা হারিয়ে যাচ্ছে আধুনিকতার ঢেউয়ে।

ঢ্যারা কী : ঢ্যারা মূলত কাঠের তৈরি এক ধরনের ঘূর্ণনযন্ত্র, যার সাহায্যে হাতে কাটা সুতা পরিপাটি করে মোড়ানো হতো। এটি সাধারণত একখ- কেন্দ্রীয় কাঠের দ-ের সঙ্গে ক্রস আকারে যুক্ত দুটি কাঠের হাতল নিয়ে তৈরি করা হয়। মাঝখানে থাকে একটি স্পিন্ডল বা কাঁটা, যেখানে সুতা জড়ানো হয়। হাত দিয়ে ঘুরিয়ে সুতাগুলো গুছিয়ে রাখা-এই ছিল ঢ্যারার প্রধান কাজ।

গ্রামের নারীদের অবসরসঙ্গী : একসময় বিকেলবেলা গ্রামের নারীরা উঠোনে বা বারান্দায় বসে ঢ্যারা ঘুরাতেন। হাতে থাকা সুতা ঢ্যারায় জড়াতে জড়াতে চলত গল্প, গান ও হাসির কলরব। ঢ্যারা শুধু একটি কাজের উপকরণই ছিল না, এটি ছিল পারিবারিক বন্ধন ও নারীসত্তার নীরব প্রতীক। অনেক সময় মেয়েরা বিয়ের আগে নিজেদের বানানো ঢ্যারা পণের সঙ্গে তুলে রাখতেন ভালোবাসা ও পরিশ্রমের নিদর্শন হিসেবে।

ঢ্যারার নির্মাণশৈলী : ঢ্যারা তৈরি হতো স্থানীয় কাঠের কারিগরদের হাতে। সাধারণত শিমুল, বাবলা বা সেগুন কাঠ দিয়ে এটি বানানো হতো। ক্রস আকারে দুটি কাঠের ডান্ডা একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা হতো যাতে ঘুরানোর সময় ভারসাম্য বজায় থাকে। উপরের দিকে বাঁকানো হাতল থাকত, যা দিয়ে ঘুরানো হতো ঢ্যারা।

লোকজ সংস্কৃতিতে ঢ্যারা : বাংলার লোকজ জীবনে ঢ্যারার উল্লেখ পাওয়া যায় গান, ছড়া ও প্রবাদে। ঢ্যারা ঘোরানো ছিল গ্রামের নারীদের নীরব শিল্পচর্চা। অনেক লোকগানে প্রেম, অপেক্ষা ও সময়ের প্রতীক হিসেবে ঢ্যারার রূপক ব্যবহার দেখা যায়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এই ছোট্ট যন্ত্রটি কেবল গৃহস্থালির বস্তু ছিল না—ছিল আবেগ ও সংস্কৃতিরও বাহক।

বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্য : বর্তমানে হাতে সুতা কাটা বা ঢ্যারা ঘোরানোর প্রচলন প্রায় নেই বললেই চলে। কারখানায় তৈরি সুতা এখন সহজলভ্য, ফলে এই ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রটি বিলুপ্তির পথে। এখন ঢ্যারা দেখা যায় কেবল জাদুঘরে, লোকসংস্কৃতি প্রদর্শনীতে কিংবা কোনো পুরনো ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা স্মৃতিবস্তু হিসেবে।

সংরক্ষণের আহ্বান : ঢ্যারা কেবল অতীতের একটি জিনিস নয়-এটি বাংলার নারীজীবন ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এই যন্ত্রটিকে সংরক্ষণ করা মানে আমাদের শিকড় ও ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা। স্থানীয় জাদুঘর, হস্তশিল্প মেলা ও লোকসংস্কৃতি উৎসবে ঢ্যারার প্রদর্শন নতুন প্রজন্মকে শেখাতে পারে অতীতের সৃজনশীলতা ও শ্রমের মূল্য।

আজ আর গ্রামের উঠোনে শোনা যায় না ঢ্যারার ঘূর্ণন। কিন্তু সময়ের গহীনে যেন এখনো বাজে সেই মৃদু শব্দ : যা মনে করিয়ে দেয়, একসময় বাংলার নারীরা তাদের জীবন, শ্রম ও ভালোবাসা গেঁথেছিলেন এই সহজ সরল যন্ত্রটির ঘূর্ণনে।