মোঃ রফিকুল ইসলাম, কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) : সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর অঞ্চলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষির পুনরুজ্জীবন ও সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় আদি যমুনা নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধারের দাবিতে স্থানীয় জনগণ ও ‘আদি যমুনা বাঁচাও আন্দোলন কমিটি’ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, চলমান সাতক্ষীরা-ভেটখালী সড়ক নির্মাণকাজের সময় শ্যামনগর উপজেলা সদরের মহাশশ্মানের পশ্চিমে ও টিএন্ডটি অফিসের পূর্ব পাশে, এবং মিঠা চন্ডিপুর এলাকায় আদি যমুনা নদীর প্রস্থ অনুযায়ী বৃহৎ ব্রিজ নির্মাণ করা হলে বহু বছরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।
হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা-ভাগীরথি-যমুনা-ইছামতি নদী ব্যবস্থার নি¤œাংশ হলো আদি যমুনা। একসময় এই নদীর মাধ্যমেই গঙ্গার মিষ্টি পানি সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হতো, ফলে অঞ্চলজুড়ে মিষ্টি ও নোনাপানির এক অনন্য ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেশ গড়ে উঠেছিল।
কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ এবং ১৯৮০-এর দশকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সড়ক নির্মাণের সময় নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে নদীটি দ্বিখ-িত হয়ে পড়ে, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ধ্বংস হয় এবং ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
পরে ভূমিদস্যুদের দখল, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘ আইনি জটিলতায় নদীটি প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যায়। দীর্ঘ আন্দোলনের পর হাইকোর্টের নির্দেশে নদী হিসেবে আদি যমুনার স্বীকৃতি ফিরে আসে এবং দখলমুক্ত করে আংশিক খনন সম্পন্ন হয়। বর্তমানে কয়েকটি স্থানে ব্রিজ নির্মাণের মাধ্যমে আংশিক প্রবাহ ফিরে এলেও সম্পূর্ণ সংযোগ এখনো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, মাদার নদী ও ইছামতির মিষ্টি পানির প্রবাহ আদি যমুনায় যুক্ত হওয়ার পথে দুটি প্রধান বাধা রয়ে গেছে-
১. শ্যামনগর উপজেলা সদরের মহাশশ্মানের পশ্চিমে ও টিএন্ডটি অফিসের পূর্বে নির্মিত সড়ক, এবং
২. মিঠা চন্ডিপুর এলাকার ছোট কার্লভাট।
তাদের দাবি, এই দুটি স্থানে নদীর প্রস্ত অনুযায়ী ব্রিজ নির্মাণ করলে ইছামতির মিষ্টি পানি মাদার নদী হয়ে সুন্দরবনে পৌঁছাতে পারবে। এতে জলাবদ্ধতা দূর হবে, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার পাবে এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকবে।
‘আদি যমুনা বাঁচাও আন্দোলন কমিটি’ নি¤œলিখিত চারটি দাবি উত্থাপন করেছেÑ
১. শ্যামনগর উপজেলা সদরের মহাশশ্মানের পশ্চিমে ও টিএন্ডটি অফিসের পূর্ব পাশে নদীর প্রস্ত অনুযায়ী বৃহৎ ব্রিজ নির্মাণ।
২. মিঠা চন্ডিপুর এলাকার ছোট কার্লভাট অপসারণ করে নদীর প্রস্থ অনুযায়ী নতুন ব্রিজ নির্মাণ।
৩. শ্যামনগরের চিংড়ীখালী মাদার নদী সংযোগস্থলের সুইস গেট অপসারণ করে দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ নির্মাণ।
৪. কালিগঞ্জের নাজিমগঞ্জ বাজার সংলগ্ন সুইস গেট পরিবর্তন করে ব্রিজ নির্মাণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইছামতির মিষ্টি পানি আদি যমুনা হয়ে সাগরে প্রবাহিত হলে নোনাপানির অনুপ্রবেশ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই কৃষি ও জীবিকা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) চলমান সড়ক নির্মাণের বাজেট পুনর্বিন্যাস করে আদি যমুনায় প্রয়োজনীয় ব্রিজ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেবে। তাদের বিশ্বাস, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কালিগঞ্জ-শ্যামনগর অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন ও সুন্দরবনের টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।