বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী

বরেন্দ্র অঞ্চলের যে সকল এলাকাকে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেচ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেগুলোতে এখন বহুমাত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় এর সমাধানকল্পে বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নির্ণয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি বরেন্দ্র অঞ্চলভুক্ত তিনটি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাকে ‘অতি উচ্চ পানি-সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা এবং পানির ব্যবহার সীমিত করার কারণে বিষয়টি নিয়ে বেশ চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। এই উদ্যোগের কারণে ফসল আবাদে সেচ নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়েছে। ভুগর্ভস্থ ও ভুউপরিস্থ পানির ব্যবহার নিয়ে যে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপ করা হয়েছে তাতে নানাপ্রকার আর্থ-সামাজিক সমস্য দেখা দেয়ার কথা। একটি পর্যবেক্ষণ দলের তথ্য থেকে জানা গেছে, পানি-সংকটাপন্ন এলাকায় সেচ নিষেধাজ্ঞার ফলে বহুমাত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং আগামীতে নতুন নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই এলাকার অনেক চাষি ও মজুর প্রায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে। একই সাথে এলাকার দরিদ্র মানুষের মধ্যে নিষেধাজ্ঞাজনিত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষেরা বলছেন, সেচ নিষেধাজ্ঞা খুবই আকস্মিক হয়েছে এবং বিকল্পগুলো নিয়ে বিবেচনার সুযোগ ছিল। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার ফলে জীবন-জীবিকার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে বা পড়বে তা যাচাই করে দেখা হয়নি। ফলে ইতোমধ্যেই ওই নিষেধাজ্ঞা এলাকার সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

পূর্ববর্তী পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে নানাবিধ প্রয়োজনে ক্রমবর্ধমান ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতার ফলস্বরূপ পানির স্তর আশংকাজনকভাবে অধঃগামী হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পানির নাগালও মিলছে না। এই পরিস্থিতিতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৫০৩টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানি-সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে সরকার চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকার ৮৭ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি পানি-সংকটের সম্মুখিন হয়েছেন। এই সংকটাপূর্ণ এলাকাগুলোতে সেচে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ২০২৪-এর ৬ নভেম্বর একটি গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। গেজেট অনুযায়ী, পানি-সংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন নলকূপ স্থাপন কিংবা বিদ্যমান নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা যাবে না। বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করলে বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩-এর ধারা অনুযায়ী দ-নীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না রেখেই সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে একটি পরিদর্শন টিমের পর্যালোচনায় এমনই তথ্য উঠে এসেছে। দলটির পর্যবেক্ষণ হলো- ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে সেচের ওপর নিষেধাজ্ঞার ফলে পানি সংকটাপূর্ণ এলাকায় বোরো ধানের আবাদ বন্ধ করতে হয়েছে। এর ফলে বহু মানুষ কর্মহীনতার শিকার হয়েছেন। কৃষকদের ধানের বদলে পানি-সাশ্রয়ী ফসল সর্ষে, তিল, মসুর ও ভুট্টা চাষের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এর শিকার হচ্ছেন চাষি ও মজুররা। তাদের কাজের পরিধি বেশ ছোট হয়ে আসছে- যা তাদের জীবন-জীবিকাকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে অনাকাক্সিক্ষত অভিবাসনের মুখেও পড়তে হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রান্তিক চাষিরাও নিরাপদ নয়। ব্যক্তিগত পানি-বাণিজ্যের প্রবণতা প্রবল হয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। প্রান্তিক চাষিরা ভূ-গর্ভস্থ পানির সেচের সুবিধাবঞ্চিত হলেও সক্ষম চাষিরা নিজ বন্দোবস্তে ঠিকই সেচ সুবিধা বজায় রাখতে পেরেছেন। একই সাথে খাবার পানি ও গৃহস্থালির জন্য ব্যবহৃত পানির চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সুযোগ নিচ্ছে ব্যক্তি উদ্যোগের সেচপাম্পের মালিকরা। তাদের পানিবিক্রির আওতা বেড়েছে। রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউনিয়নের উঁচাডাঙ্গা গ্রামে একটি টেস্ট বোরিং-এর প্রদর্শিত তথ্যে জানা যায়, এই পয়েন্টে ১৬০ ফুটের পর টানা দেড় হাজার ফুটের মধ্যে পানির কোনো স্তর নেই। গ্রামে বিএমডিএ’র গভীর নলকূপটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এলাকাবাসী যারা অবস্থাপন্ন তারা নিজ ব্যয়ে পাম্প বসিয়ে খাবার পানির প্রয়োজন মেটাচ্ছে। তারা দিব্যি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিজেদের ফসলে সেচও প্রদান করছে। কোনো কোনো স্থানে ভূ-গর্ভস্থ স্তর পানিশূন্য হওয়ায় বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) তাদের গভীর নলকূপ তুলে নিয়ে গেছে। সেচ সুবিধার অভাব বা নিষেধাজ্ঞার কারণে বোরো আবাদ বন্ধ হওয়ায় জমিতে কাজ করা স্থানীয় লোকজন বেকার হয়েছেন। তারা অন্যের বোরো জমিতে কাজ করতেন। শ্রমিকরা ধান কেটে পারিশ্রমিক হিসেবে ধান পেতেন। এই ধান তাদের বছরের খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়ক হতো। এক মণ ধান কাটলে ৮ কেজি ধান মজুরি পেতেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউনিয়নের ৪-৫ হাজার মজুর কাজ নিয়ে সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। তারা অনেকেই সুযোগ পেলে অন্য জেলা বা উপজেলায় গিয়ে মজুরের কাজ করছেন। এর একটি সুরাহা না হলে ভবিষ্যতে সমস্যা আরো বাড়বে। স্থানীয়রা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির যেমন সুরক্ষা দিতে হবে- তেমনই তাদের ফসল উৎপাদনের জন্য সেচ সুবিধার বিকল্প সরকারকেই করতে হবে। বোরো ধানের আবাদ বন্ধ করা সমস্যার সমাধান নয়। বোরো আবাদের সাথে তাদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাদের মতে, সেচের জন্য পদ্মা বা মহানন্দা নদীর পানি এ ক্ষেত্রে ভাল সমাধান হতে পারে। একজন গৃহিনী বলেন, খাওয়া ও গৃহস্থালির কাজের জন্য যে পরিমাণ পানি তারা ব্যবহার করেন তাতে তাদের প্রয়োজন মেটে না- এর জন্য আরো মোটর (সেমি ডিপ) বসাতে হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার একজন পর্যবেক্ষক দলকে বলেন, বরেন্দ্র এলাকার খরা মোকাবিলায় বেশ কিছু উদ্যোগের কথা শোনা যায়। কিন্তু তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না। যেমন- ভবন কোড অনুযায়ী বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে এর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় না। কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টির পানি ভূ-গর্ভ স্তরে নিয়ে রিচার্জ করার উদ্যোগও তেমন এগোয়নি। তিনি বোরো মৌসুমে পদ্মার পানির ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, এক সময় উপজেলার নেজামপুরে ভূ-স্তরের ৪৫ ফিটের মধ্যেই পানি পাওয়া যেতো, এখন ১৫০ ফিটেও পানি পাওয়া যায় না। এই পরিস্থিতি ভয়াবহ দুর্যোগের ইঙ্গিত দেয়। অপর একজন ভুক্তভোগী জানান, তাদেরকে প্রতিমাসে জনপ্রতি ২০ টাকা করে পানির জন্য দিতে হয়। সদ্যজাত শিশুর জন্যও এই চার্জ প্রযোজ্য। এখানে গরুপ্রতিও ২০ টাকা দিতে হয়। খাবার ও নিত্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহকে সেবা নয়Ñ ব্যবসায়িক বিবেচনায় দেখা হয়। পর্যবেক্ষণ দলের মতে, অচিরেই বিকল্প ব্যবস্থা না হলে- পারিবারিক কৃষি ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাদের পরামর্শ হলো, বোরো আবাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনমাস মজুরদের জন্য সরকারি প্রণোদনা প্রয়োজন। আরো প্রয়োজন ভূ-উপরিস্থ জলাধার-পুকুর, খাড়ি, বিল-নদী উদ্ধার ও খনন করা এবং সামাজিক মালিকানায় নেয়া। সেচ কাজে পদ্মা ও মহানন্দার পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, বিএমডিএ’র কর্মপরিধি পর্যালোচনাপূর্বক তা পুনঃনির্ধারণ করা আবশ্যক এবং সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কৃষি ও সেচ বিষয়ক কর্মকা-ে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে জনবান্ধব কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হোক। বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির স্তর সংকট কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক-সর্বোপরি মানবিক সমস্যা। সেই নিরিখেই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সমাধান দিতে হবে।

বিএমডিএ’র ভাষ্য

বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) বলছে, বরেন্দ্র এলাকার বৃষ্টিপাত দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় অনেক কম। সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া বৃষ্টিপাত পূর্বের ন্যায় যথাসময়ে হচ্ছে না। সর্বোপরি সংস্কারের অভাবে নদী ও বিলগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজ ক্রমান্বয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিএমডিএ বর্তমানে সেচ কাজে ভূ-পরিস্থ পানি ব্যবহারের উপর ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে ৩ হাজারের বেশি পুকুর ও ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। বরেন্দ্র এলাকার ভূমি উচু-নিচু হওয়ায় পানি সংরক্ষণের জন্য খালে ৬শ’ ৯৬টি ক্রসড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে।

বিএমডিএ বিশাল জলাধার নির্মাণেরও উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ইতোমধ্যে পোরশা উপজেলায় বছরব্যাপী সেচ কার্যক্রমের জন্য ১৭ একরের একটি জলাধার পূনঃখনন করা হয়েছে। সেচ কার্যক্রমে নদীর পানি ব্যবহারের লক্ষ্যে গোদাগাড়ীতে পদ্মানদী থেকে ২টি স্থাপনা হতে পানি উত্তোলন করে সাড়ে ৩ কি.মি. দূরে ২৪ কি.মি. দীর্ঘ সরমংলা খালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। খাল থেকে বিভিন্ন স্থানে পাম্পের মাধ্যমে ২ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে বছরব্যাপী সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই স্থানে নদী থেকে পানি উত্তোলন করে ৫টি পুকুরে পানি স্থানান্তর করে ৪শ’ হেক্টর বৃষ্টিনির্ভর এক ফসলী জমিতে সারা বছর সেচের ব্যবস্থা হয়েছে। পুঠিয়ার ইউসুফপুরে পদ্মা নদীর পানি উত্তোলন করে ৩০ কি.মি. দীর্ঘ খালে স্থানান্তর করে ১ হাজার ২শ’ হেক্টর জমিতে বছরব্যাপী চাষাবাদের জন্য গৃহীত প্রকল্পের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও পদ্মা, মহানন্দা ও আত্রাই নদী হতে পাম্পের সাহায্যে পানি উত্তোলন করে সরাসরি জমিতে সেচ প্রদানের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত এ ধরণের ১৪৬টি পাম্প স্থাপন করে সেচের ব্যবস্থা হয়েছে। এছাড়াও ভূ-পরিস্থ পানি সংরক্ষণ করে সেচকাজে ব্যবহার করার জন্য ছোট ছোট নদীতে রাবারড্যাম স্থাপন করা হচ্ছে।