নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম : গত ১৫ মাসে চট্টগ্রাম মহানগরে অন্তত ১১৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন থানায় মোট ১১৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই উদ্বেগজনক চিত্র নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলেছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও পারিবারিক বিরোধ-এসব কারণেই অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। কিছু ঘটনায় ছিনতাই ও ডাকাতির সময়ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। অনেক ঘটনায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে, গুলী করে বা ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে, যা জনমনে ভয় আরও বাড়িয়েছে।
গত ১৫ মাসে মহানগরের বিভিন্ন থানা এলাকায় খুনের ঘটনায় পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু থানা এলাকায় তুলনামূলকভাবে খুনের ঘটনা বেশি আলোচনায় এসেছে। এসব এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক বিরোধ প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
ডবলমুরিং শিল্পাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় এখানে আধিপত্য বিস্তার ও ব্যবসায়িক বিরোধে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলী করে হত্যার ঘটনাও আলোচিত হয়।
পাহাড়তলী ও খুলশী থানা এলাকায় মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের সংঘর্ষে খুনের ঘটনা ঘটেছে। কিছু ঘটনায় তরুণ ও কিশোর বয়সী ব্যক্তিরাও জড়িত ছিল বলে পুলিশ জানায়।
শিল্পাঞ্চল ও পাহাড়ঘেঁষা হওয়ায় বায়েজিদ এলাকায় শ্রমিক বিরোধ, জমি দখল ও পূর্বশত্রুতার জেরে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। কয়েকটি ঘটনায় লাশ উদ্ধার হলেও আসামী শনাক্তে সময় লেগেছে।
চান্দগাঁও এলাকায় পারিবারিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তার এবং কোতোয়ালিতে ছিনতাই ও অপরাধমূলক ঘটনার সময় হত্যার ঘটনা সামনে আসে। কোতোয়ালি এলাকায় বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় অপরাধপ্রবণতা তুলনামূলক বেশি।
রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল ইপিজেড এলাকায়ও গত ১৫ মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিক বিরোধ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জেরে এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
নগরের দক্ষিণাংশের কর্ণফুলী এলাকায় পারিবারিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কর্ণফুলী শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকার সংমিশ্রণ হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
ঘনবসতিপূর্ণ হালিশহর এলাকায় মাদক, কিশোর গ্যাং ও ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে খুনের ঘটনা ঘটেছে। জনবহুল এলাকায় এসব হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত খুলশীতেও গত ১৫ মাসে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ব্যক্তিগত বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও মাদক সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্বের জেরে এসব খুন সংঘটিত হয়েছে। তুলনামূলক শান্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত খুলশীতে খুনের ঘটনা নগরবাসীর উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
মোট ১১৮টি হত্যাকাণ্ডের বিপরীতে ১১৩টি মামলা হলেও সব মামলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশ কিছু মামলায় এখনো মূল আসামিরা পলাতক। কোনো কোনো ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে মামলা হওয়ায় তদন্ত জটিল হয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী না পাওয়া, প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ার কারণে বিচার কার্যক্রম ধীরগতির হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অপরাধপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি, টহল জোরদার এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিলের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
নগরবাসীর মতে, খুনের সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় মানুষ চলাচলে অনীহা প্রকাশ করছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অপরাধ দমনে আরও কঠোর পদক্ষেপ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশি অভিযান এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়; সামাজিক অবক্ষয় রোধ, মাদক নিয়ন্ত্রণ, বেকারত্ব কমানো এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নইলে নগরে খুনসহ সহিংস অপরাধ কমানো কঠিন হবে।