নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম জেলায় লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষি খাত মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জেলার প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর কৃষি জমি বর্তমানে চাষাবাদের অনুপযোগী বা উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর ফলে বছরে লক্ষ লক্ষ টন ধান উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৩৯৬ কোটি টাকা থেকে ৮১৬ কোটি টাকা পর্যন্ত।

কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাধারণভাবে প্রতি হেক্টর জমিতে বছরে গড়ে ৩ থেকে ৬ টন ধান উৎপাদিত হয়। সে হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমি থেকে বছরে উৎপাদিত হওয়ার কথা ছিল ১ লাখ ২০ হাজার টন থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার টন ধান। কিন্তু প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিরূপতার কারণে এই বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

ধান উৎপাদন না হওয়ায় বিপুল আর্থিক ক্ষতি: আমন মৌসুমে সরকার সাধারণত প্রতি কেজি ধান ৩৩ থেকে ৩৪ টাকা দরে ক্রয় করে। সেই হিসাবে-প্রতি টন ধানের দাম ৩৩ হাজার টাকা ধরলে ১ লাখ ২০ হাজার টন ধানের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩৯৬ কোটি টাকা। প্রতি টন ধানের দাম ৩৪ হাজার টাকা ধরলে একই পরিমাণ ধানের মূল্য প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, যদি উৎপাদন ব্যাহত হয় ২ লাখ ৪০ হাজার টন ধান, তবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৯২ কোটি টাকা থেকে ৮১৬ কোটি টাকা পর্যন্ত।

লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা: চট্টগ্রাম জেলায় লবণাক্ততার প্রভাব রয়েছে মোট ২০ হাজার ৩১২ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলো হলো- সন্দ্বীপ: ১১,৭০০ হেক্টর, বাঁশখালী: ২,২০০ হেক্টর, সীতাকুন্ড: ২,০০০ হেক্টর, পটিয়া: ৩,০০০ হেক্টর, আনোয়ারা: ৬০০ হেক্টর, মিরসরাই: ৫০০ হেক্টর, চন্দনাইশ: ২৫০ হেক্টর, বোয়ালখালী: ৫০ হেক্টর, পতেঙ্গা: ১০ হেক্টর, ডবলমুরিং: ২ হেক্টর।

খরাপ্রবণ এলাকা

খরার ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ১১ হাজার ২১০ হেক্টর জমি। এর মধ্যে-মিরসরাই: ৬,০০০ হেক্টর, সীতাকুন্ড: ২,২০০ হেক্টর, লোহাগাড়া: ১,৫০০ হেক্টর, সন্দ্বীপ: ৫৬০ হেক্টর, রাউজান: ৫০০ হেক্টর, পাঁচলাইশ: ৪০০ হেক্টর, পটিয়া: ৫০ হেক্টর।

জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা

জেলায় জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে প্রায় ৮,২৭৫ হেক্টর জমি। এর মধ্যে-সীতাকুন্ড: ৬,২০০ হেক্টর, সন্দ্বীপ: ১,৮৫০ হেক্টর, আনোয়ারা: ১,০০০ হেক্টর, বোয়ালখালী: ১,০১৫ হেক্টর, হাটহাজারী: ১,০৪০ হেক্টর, রাউজান: ৭৭০ হেক্টর, পটিয়া: ৫৪০ হেক্টর, পাঁচলাইশ: ৬০০ হেক্টর, লোহাগাড়া: ৮০০ হেক্টর, বাঁশখালী: ৫০ হেক্টর, সাতকানিয়া: ৫০ হেক্টর, মিরসরাই: ৩০০ হেক্টর, পতেঙ্গা: ১০ হেক্টর।

বর্তমান পরিস্থিতি ও শঙ্কা

প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ উপজেলার কৃষকরা ত্রিমুখী (লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতা) সংকটে সবচেয়ে বেশি জর্জরিত। মিরসরাই অঞ্চলে খরার প্রকোপ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ, লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতের ধানের বিস্তার এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা না যায়, তবে এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

সমাধানের দাবি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামের কৃষি খাতে বছরে প্রায় ৪০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার যে ক্ষতি হচ্ছে, তা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং সঠিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই এই বিশাল পরিমাণ ধান উৎপাদন করা সম্ভব। লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, খরা সহনশীল ও লবণ সহিষ্ণু ধান জাতের সম্প্রসারণ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং আধুনিক সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে চট্টগ্রামের খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, এসব জমিতে একেবারেই যে ফসল হয় না এমন নয়। কিছু জমিতে আমন ধান চাষ করা হয়। বোরো ও রবি মৌসুমে সবজি চাষ হয়। লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, খরা সহনশীল ও লবণ সহিষ্ণু ধান জাতের সম্প্রসারণে কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।