রংপুর অফিস : রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গত শুক্রবার রাতে ঝড়ো বাতাসসহ ব্যাপক শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। রাত একটা থেকে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী এই শিলাবৃষ্টি অব্যাহত থাকে।‎ এদিকে রংপুরে ঝড়ে বিছিন্ন হওয়া বিদ্যুতের লাইনে স্পৃষ্ট হয়ে কাজলী বেগম নামে এক নারী নিহত হয়েছে।

স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শিলাবৃষ্টির আঘাতে অনেক ঘরবাড়ি এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে উঠতি বোরো ধান ক্ষেতসহ, তামাক, ভুট্টা এবং আম ও লিচুর বড় ধরনের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, গত শুক্রবার দিবাগত গভীররাতে শিলাবৃষ্টিসহ ঝড়ো হাওয়ার সময় রংপুর নগরীর বাহার কাছনা বাঙ্গীটারী এলাকার একটি বাড়ির বিদ্যুতের মিটারের একটি তার ছিড়ে পুরো বাড়ি বিদ্যুতায়িত হয়ে যায়।

গতকাল শনিবার ভোরবেলা ঐ বাড়ির কাজলী বেগম (৩০) নামে এক গৃহবধু নামাজ পড়ার জন্য ঘরের দরজা স্পর্শ করলে তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধারে পরিবারের অন্য সদস্যরাও এগিয়ে এলে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে ৫ জন আহত হন। পরে এলাকাবাসী গুরুতর আহত কাজলী বেগমকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।

কালীগঞ্জ (লালমনিরহাট)

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় আকস্মিক শিলাবৃষ্টিতে টিনের ঘরবাড়ি, মসজিদ, মন্দির ও বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষক ও নি¤œআয়ের মানুষ।

শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। ভোটমারী, তুষভান্ডার ও কাকিনা ইউনিয়নে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। বিশেষ করে ভুট্টা, মরিচ, আম, লিচু ও বিভিন্ন সবজি চাষিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শিলার আঘাতে অনেক জমির ফসল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে।

ভোটমারী ইউনিয়নের শৌলমারী এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক উকিল আমিন বলেন, হঠাৎ করে বড় বড় শিলা পড়তে শুরু করে। আমার ঘরের টিন ফুটো হয়ে গেছে, আবাদি পাঁচ বিঘা জমির ভুট্টার গাছ ভেঙে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো বুঝতে পারছি না।

এদিকে, কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আক্তার জাহান শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্রুত তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন।

ইউএনও শামীমা আক্তার জাহান বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা হাতে পাওয়ার পর অতি দ্রুত সরকারি সহায়তা প্রদান করা হবে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

মাগুরা

মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার দুর্গাপুর মাঠে কৃষি কাজ করার সময় মোঃ সুরুজ (৩৪) নামের এক কৃষক বজ্রপাতে আহত হন।তাঁর সাথে থাকা লোকজন তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য দারিয়াপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত ব্যক্তি পাবনা জেলায় ভাঙ্গুরা থানার জয়রামপুর গ্রামের গুলজারের পুত্র।

পতœীতলা (নওগাঁ)

নওগাঁ জেলার পতœীতলা উপজেলার শিহাড়া ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী শীতল মাঠ এলাকায় গম কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে তিনজন কৃষক আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে একজন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন এবং অপর দুইজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

জানা গেছে, গত ভোররাতে মাঠে গম কাটার সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই আশরাফ (পিতা: আইনাল হক) মারা যান। এ সময় তার সঙ্গে থাকা আরও দুই কৃষক—তারেক (পিতা: কামাল) এবং শরিফ (পিতা: আইনাল হক)—গুরুতর আহত হন।

স্থানীয়রা দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে সাপাহার মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

নিহত ও আহত তিনজনই পতœীতলা উপজেলার শীতল মাঠ এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

এ বিষয়ে পতœীতলা থানার ডিউটি অফিসার জানান, বজ্রপাতে একজন নিহত ও দুইজন আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

স্থানীয়রা কৃষিকাজের সময় বজ্রপাতের ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

বোদা (পঞ্চগড়)

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় শুক্রবার রাতে মাত্র কয়েক মিনিটের তীব্র শিলাবৃষ্টি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। ক্ষেতে থাকা বোরো ধান, গম, ভুট্টা ও সবজির পুরো ফলন নষ্ট হয়ে গেছে, পাশাপাশি টিনের ছাউনি ফুটো হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে কাঁচা ঘর ভেঙে গেছে বহু এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ কালো মেঘে ঢেকে যায় আকাশ, তারপর শুরু হয় ঝোড়ো হাওয়া ও বড় আকৃতির শিলাবৃষ্টি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফসলের মাঠ ল-ভ- হয়ে যায়। উপজেলার ঝলইশালশিড়ি, মাড়েয়া, বেংহারী, বোদা পৌরসভার ভাসাইনগর, বোদা ইউপির তিতোপাড়া, মাঝগ্রামসহ প্রায় সব এলাকাতেই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুধু ফসল নয়, শিলার আঘাতে ঘরের চালা ফুটো হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্বিষহ অবস্থা সৃষ্টি হয়। ঝলইশালশিড়ি ইউপি আমিরুল ইসলাম বলেন, “শিলাবৃষ্টিতে পুরো বছরের পরিশ্রম তছনছ হয়ে গেছে। টিনের ছাউনি ফুটো হয়ে ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে সব ভিজে গেছে। রাতে কেউই ঘুমাতে পারিনি। এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার রবিউল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ এলে দ্রুত সহায়তা দেওয়া হবে। খবর পেয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব ফরহাদ হোসেন আজাদ সকাল ৭ টায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন।

লালমনিরহাট

শিলা বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে লালমনিরহাটে ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। লালমনিরহাটের ৫ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আকস্মিক শিলা বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে বসতবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার ২৭ মার্চ দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে শুরু হওয়া মাত্র ১০ মিনিটের এই তা-বে ল-ভ- হয়ে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, উপড়ে পড়েছে গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি। এতে কৃষকের মাঠের ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের স্বপ্ন এখন মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার উপক্রম।

মধ্যরাতের এই ঝড়ের সময় জেলা সদর, আদিতমারী, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিলাবৃষ্টির তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যেই অনেকের টিনের ঘরের চালা ফুটো হয়ে গেছে । অনেক স্থানে বড় বড় গাছ ভেঙে বসতঘরের ওপর পড়ায় অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন বাসিন্দারা। বিধ্বস্ত হয়েছে অসংখ্য কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি।

হঠাৎ শুরু হওয়া এই দুর্যোগে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করে। আতঙ্কের বর্ণনা দিতে গিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, রাতে যে পরিমাণ বৃষ্টি আর বড় বড় পাথর (শিলা) পড়েছে, তাতে ভয়ে ঘরে থাকতে পারছিলাম না। বাচ্চাদের নিয়ে সারারাত বসে কাটিয়েছি। আজকেও আকাশ মেঘলা, গতকালের মতো শিলাবৃষ্টি হলে ঘরটাই ভেঙে যাবে। দিনে এনে দিনে খাই, আমরা গরিব মানুষ। ঘরবাড়ি ভেঙে গেলে নতুন করে কীভাবে তৈরি করব?

শিলাবৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন কৃষকরা। মাঠের পর মাঠ উঠতি ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা এখন দিশেহারা। আদিতমারী উপজেলার কৃষক মাহবুবুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ৪ দোন (স্থানীয় জমির পরিমাপ) জমিতে ভুট্টা চাষ করেছিলাম। রাতের শিলাবৃষ্টি ও বাতাসে ক্ষেতের অনেক ক্ষতি হয়েছে। ভুট্টা গাছ হেলে পড়েছে। শুকাতে দেওয়া তামাক পাতাগুলো ফুটো হয়ে ভিজে গেছে। এবার আর দাম পাবো না। ভেবেছিলাম তামাক বিক্রি করে ঘরের ফুটো টিনগুলো বদলাবো। কিন্তু এখন তো সব নষ্ট হয়ে গেল। গরিব মানুষ, এখন চেয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।